১৯৭১
Chronology
Photo: Shilpacharya Zainul Abedin.
নোট: একাত্তর আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বছর। এর পূর্ণাঙ্গ কালপঞ্জি তৈরির সামর্থ্য আমার নেই। হয়তো যোগ্যতাও নেই। সাধ্যে যেটুকু কুলিয়েছে, আমি স্রেফ সেটুকু করেছি। সময় আর সবরের অভাবে অনেককিছুই বাদ পড়ল। ভবিষ্যতে, বেঁচেবর্তে থাকলে, হয়তো খামতিটা পূরণ করব। আমি না থাকলে, অন্য কেউ নিশ্চয়ই করবে।
জানুয়ারি
৩ আগের বছরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকেটে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদেরকে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে – বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান – ৬ দফা ও ১১ দফা বাস্তবায়নের শপথ পাঠ করালেন আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান।
৪ মুজিব বললেন, “ছয়দফার পক্ষে জনগণের রায় ও গণভোটের ফলাফল নির্বাচিত এমএনএদের পরিবর্তনের ক্ষমতা নেই।”
১১ ঢাকায় আসলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান।
১২-১৩ ঢাকায় ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠক।
১৩ ভুট্টো বললেন, “একটা সর্বসম্মত সংবিধান প্রণয়ন এখন হচ্ছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।”
১৪ ইয়াহিয়া বললেন, “শেখ মুজিবুর রহমান হচ্ছেন দেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী। যখন তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করবেন, আমি আর থাকব না। এটা শীঘ্র শেখ মুজিবের সরকার হবে।”
১৭ লারকানায় ইয়াহিয়া-ভুট্টো বৈঠক।
১৯ রাওয়ালপিণ্ডিতে ইয়াহিয়া-ভুট্টো বৈঠক।
২৭-৩০ ঢাকায় আসলেন জুলফিকার আলি ভুট্টো। তিনি স্বীকার করলেন, গণপরিষদের অধিবেশনের পূর্বে দীর্ঘ অন্তর্বর্তী অবস্থা কর্তৃত্বের সমস্যার সৃষ্টি করবে। মুজিব-ভুট্টো আলোচনা।
৩০ ভুট্টো বললেন, “শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনায় অচলাবস্থা হয়নি। আমি পরবর্তীতে আরও আলোচনায় রাজি আছি।” লাহোরে ভারতীয় বিমান হাইজ্যাক করলেন ২ কাশ্মীরি।
ফেব্রুয়ারি
৩ মুজিব বললেন, “লাহোরে হাইজ্যাক করা ভারতীয় বিমান ধ্বংসের ব্যাপারে পূর্ণ তদন্ত হওয়া দরকার। এ-ধরণের ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি যাতে না হয় তার জন্য সমস্ত রকমের ব্যবস্থা গ্রহণ করা বাঞ্চনীয়।” ভারতের ওপর দিয়ে পাকিস্তানের বিমান চলাচল বন্ধ।
৯ মুজিব বললেন, “পাকিস্তানের রাজনীতি হচ্ছে ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার রাজনীতি। পার্লামেন্ট অধিবেশন আহ্বানে অহেতুক বিলম্ব দুঃখজনক।”
১৩ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া কর্তৃক পাকিস্তানের জন্য একটি সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ সকাল নয় ঘটিকায় ঢাকার পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেষিক পরিষদ ভবনে পাকিস্তান জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহ্বান।
১৫ মুজিব বললেন, “ছয়দফার ভিত্তিতে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সংবিধান প্রণীত হবে। গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তিদের সংখ্যাধিক্যের রায় মেনে নেয়া বাঞ্চনীয়। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যবস্থার আহ্বান জানাচ্ছি।” ভুট্টো বললেন, “নির্বাচিত সংখ্যাগুরু দল (আওয়ামি লীগ) প্রকাশ্যে বা গোপনে আমাদের কিছুটা ‘কনসেশনের’ প্রতিশ্রুতি দেওয়া না পর্যন্ত পিপলস পার্টি ঢাকায় ৩ মার্চে আহূত জাতীয় সংসদের অধিবেশনে যোগ দেবে না।”
১৬ ভাসানী বললেন, “জুলফিকার আলী ভুট্টো কর্তৃক প্রদত্ত পূর্বশর্ত পাকিস্তানের প্রতি ‘হুমকিস্বরূপ’।” ভুট্টো ঘোষণা দিলেন, তাঁর সিদ্ধান্ত বাতিলযোগ্য নয়।
১৭ ভুট্টো বললেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে ঢাকায় আসন্ন জাতীয় সংসদের অধিবেশনে যোগদান অর্থহীন।” মুজিব বললেন, “স্বার্থান্বেষী মহল থেকে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর নস্যাৎ করার প্রচেষ্টা চলছে।”
২১ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তাঁর বেসামরিক মন্ত্রীসভা ভেঙে দিলেন। ইসলামাবাদে প্রাদেশিক গভর্নর ও সামরিক প্রশাসকদের বৈঠক। বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের এক প্রচারপত্রে স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা কায়েম করার ডাক দেয়া হল।1
২৪ এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ মুজিব বললেন, “ছয় দফার কোন রদবদল করা সম্ভব নয়।”
২৬ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ফিরে এসে শেখ মুজিবের সাথে ২ বার সাক্ষাৎ করলেন গভর্নর আহসান।
২৮ যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত জোসেফ ফারল্যান্ড শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে তাঁর ধানমণ্ডির বাসায় সাক্ষাৎ করেন। এ সময় মুজিব ফারল্যান্ডকে বলেন তিনি পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চান না। তিনি একটা কনফেডারেশন চান যেখানে বাংলাদেশ তার ন্যায্য হিস্যাটুকু পাবে।
মার্চ
১ পিপলস পার্টির উপস্থিতি ছাড়া যথারীতি সংসদ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হলে “সমগ্র পশ্চিম পাকিস্তানে ভয়াবহ গণআন্দোলন” গড়ে তোলার এবং “পেশোয়ার থেকে করাচি পর্যন্ত জীবনযাত্রা নীরব ও নিথর করে” দেয়ার হুমকি দিলেন ভুট্টো। “পাকিস্তানে এক ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকটের সৃষ্টি” হওয়ার দোহাই দিয়ে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করলেন ইয়াহিয়া খান। গভর্নর আহসানের পরিবর্তে বেসামরিক গভর্নরের দায়িত্ব পেলেন সামরিক প্রশাসক সাহেবজাদা ইয়াকুব খান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী ও সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ, ডাকসুর ভিপি আ স ম আবদুর রব এবং সাধারণ সম্পাদক আবদুল কুদ্দুস মাখন মিলে গঠন করলেন স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। প্রতিবাদে ঢাকাসহ সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে বিক্ষোভ, ফার্মগেটে নিরস্ত্র জনতার বুকে গুলি চালাল পুলিশ। কারফিউ জারি করা হল।
২ সিরাজ সিকদারের পূর্ব পাকিস্তান শ্রমিক আন্দোলন শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্যে পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনের খোলা চিঠি নামে একটা প্রচারপত্র বিলি করতে শুরু করল, যেখানে মুজিবকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার আহবান জানান হল। হরতাল ডাকলেন শেখ মুজিব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত লাল সবুজ পতাকা উত্তোলন করলেন ডাকসুর ভিপি ও ছাত্রলীগ নেতা আ স ম আবদুর রব। পতাকাটি পরিকল্পনা করেছিলেন ও এঁকেছিলেন শিবনারায়ণ দাশ। পরবর্তীতে মানচিত্র বাদ দিয়ে এই পতাকাটিই স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ঢাকায় কারফিউ ভঙ্গ করে বিক্ষোভ, বহু হতাহত।
৩ ইয়াহিয়া আলোচনার আহ্বান জানালে শেখ মুজিব জানিয়ে দিলেন, জনতার ওপর গুলিবর্ষণের তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত কোন আলোচনা করবেন না। অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। পল্টন ময়দানে নূরে আলম সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে ছাত্রলীগের আয়োজিত বিশাল জনসভায় স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রস্তাবিত জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করা হল ও জাতীয় পতাকা প্রদর্শন করা হল। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন। প্রচার করা হল স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ঘোষণাপত্র। চট্টগ্রামে স্থানীয় বাঙালি আর উর্দুভাষীদের মধ্যে সংঘর্ষ। Sen (1999) দাবি করেছেন, এ সময় বাঙালি ‘mob’য়ের হামলায় ৩০০রও বেশি উর্দুভাষীর মৃত্যু হয়।2
৪ রেডিও পাকিস্তান ঢাকার নাম বদলে ঢাকা বেতার কেন্দ্র রাখা হল।
৫ শেখ মুজিবের আহবানে টানা পাঁচদিন হরতাল পালন। পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ গুলি চালাল। সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়া হল।
৬ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এক বেতার বক্তৃতায় ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবান করলেন।
৬, দিবাগত রাত ৩২ নম্বরে বৈঠক করলেন আওয়ামি লীগ নেতারা। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ভেঙে পালালেন ৩২৫ কয়েদী। এ সময় ৭ জনকে খুন করা হয়।
৭ যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত জোসেফ ফারল্যান্ড ৩২ নম্বরে মুজিবের সাথে এক সংক্ষিপ্ত বৈঠকে বললেন, “পূর্ববাংলায় স্বঘোষিত স্বাধীনতা হলে যুক্তরাষ্ট্র তা সমর্থন করবে না।” ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে – বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান – শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ভাষণে বললেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” জাতীয় পরিষদ অধিবেশনে যোগদানের ব্যাপারে কয়েকটি শর্ত প্রদান করলেন শেখ মুজিব: সামরিক আইন প্রত্যাহার করা, সেনাদের ব্যারাকে ফেরানো, হত্যা তদন্ত করা, ও জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। ঘোষিত হল অসহযোগ আন্দোলনের ১০ দফা কর্মসূচি। যশোর ও খুলনায় সৈন্যবাহী ট্রেনে আক্রমণ। রাজশাহী, যশোর ও খুলনায় টেলিফোন ভবনে হামলা। লে. জে. সাহেবজাদা ইয়াকুব খানের স্থলে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিযুক্ত হয়ে ঢাকায় আসলেন লে. জে. টিক্কা খান।
৯ পল্টন ময়দানে এক জনসভায় পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ২৫ মার্চের মধ্যে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা না দিলে শেখ মুজিবুর রহমানকে সাথে নিয়ে মুক্তিসংগ্রাম শুরু করার ঘোষণা দিলেন মৌলানা ভাসানী।
১১ অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত রাখায় জনতাকে ধন্যবাদ দিলেন তাজউদ্দিন আহমদ।
১২ পাকিস্তান দাবি করল, বিক্ষোভকারীদের সহায়তা করছে এমন কিছু ভারতীয়কে পাকড়াও করা হয়েছে।
১৪ অধ্যাপক আহমদ শরীফের সভাপতিত্বে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত হল লেখক সংগ্রাম শিবিরের জরুরি সভা।3
১৫ পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে খেতাব বর্জন শুরু হল। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন বর্জন করলেন হেলাল-ই ইমতিয়াজ। অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী বর্জন করলেন সিতারা-ই ইমতিয়াজ। ঢাকায় এলেন ইয়াহিয়া। ১৮ পাঞ্জাব ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটেলিয়নের তত্ত্বাবধানে স্থানীয় প্রেসিডেন্ট হাউজে গমন করলেন।
১৬-২৪ মুজিব-ইয়াহিয়া-ভুট্টোর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক ও ত্রিপাক্ষিক বৈঠক শুরু।
১৭ ৩২ নম্বরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মুজিব বললেন, “আমাদের সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে এবং লক্ষ্যে উপনীত না হওয়া পর্যন্ত তা চলবে।” রাত দশটায় জিওসি মেজর জেনারেল খাদেম হোসেন রাজাকে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেয়ার হুকুম দিলেন গভর্নর টিক্কা খান। ঢাকায় সামরিক জান্তার জেনারেলদের এক বৈঠক প্রণীত হল জেনোসাইডের নীলনকশা।
১৯ জয়দেবপুরে গুলি চালাল সেনাবাহিনী, কারফিউ জারি করা হল। রাজধানী ঢাকায় অসংখ্য প্রতিবাদ সভা ও শোভাযাত্রা। শেখ মুজিব এক বিবৃতিতে বললেন, “তারা যদি মনে করে থাকে যে, বুলেট দিয়ে জনগণের সংগ্রাম বন্ধ করতে সক্ষম হবে, তাহলে তারা আহাম্মকের স্বর্গে বাস করছে।”
২০ লে. জেনারেল আব্দুল হামিদের ফ্ল্যাগ স্টাফ হাউসে টিক্কা খানের সাথে বৈঠক এবং অপারেশন সার্চলাইটয়ের অনুমোদন।
২১ মুজিব তাঁর বাসভবনের সামনে এক বিরাট জনসমাবেশে বললেন, “সাড়ে সাত কোটি মানুষের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলনের গতি কোনভাবেই মন্থর করা যাবে না।”
২২ ২৫ মার্চ অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় পরিষদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হল। প্রতিটি সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা মুদ্রণ করা হল।
২৩ আওয়ামী লীগের উদ্যোগে পালিত হল প্রতিরোধ দিবস। বেতার ও টিভিতে গাওয়া হল সোনার বাংলা।4 ঢাকায় স্রেফ ক্যান্টনমেন্টে আর প্রেসিডেন্ট হাউজে উড়ল পাকিস্তানের পতাকা। অন্য সব জায়গায় উড়ল স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। পাকিস্তানের পতাকা কোথাও কোথাও ছিঁড়ে ফেলা হল। জিন্নার ছবিতে অগ্নিসংযোগ। যশোরে ইপিআর সদরদপ্তরে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করলেন জওয়ানরা।
২৪ রংপুর, চট্টগ্রাম প্রভৃতি স্থানে সামরিক পদক্ষেপ নেয়ায় এক বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামি লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ।
২৫, দিন ভুট্টো-ইয়াহিয়া বৈঠক, বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের করা প্রশ্নের জবাবে বললেন ভুট্টো, “অবস্থা অত্যন্ত সংকটপূর্ণ।”
২৫, দিবাগত রাত অপারেশন সার্চলাইট।5
২৬ ইয়াহিয়া খান তার বেতার বক্তৃতায় ‘শাসনতান্ত্রিক সংকটের’ জন্য শেখ মুজিবুর রহমানকে দায়ী করলেন। আওয়ামী লীগকে বেআইনী ঘোষণা করা হল, শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের শত্রু ঘোষণা করা হল। এ সময়ই কখনো প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র, যদিও আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম আরো পরে শুরু হয়েছিল।
২৭ চট্টগ্রামের কালুরঘাটের স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন মেজর জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের পার্লামেন্টে উদ্বেগ প্রকাশ করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধী। বাংলাদেশি শরণার্থীদের জন্য সীমান্ত খুলে দেয় ভারত।
টঙ্গী হত্যাযজ্ঞ।
২৮ শেখ মুজিবুর রহমানকে করাচিতে নিয়ে যাওয়া হল।
৩০ “৩০ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের ছাদ থেকে ১৮ বছরের এক ছাত্রীর লাশ তুলেছি। তার গায়ে কোন গুলির চিহ্ন ছিল না। দেখলাম তার মাথার চুল ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে, লজ্জাস্থান থেকে পেট ফুলে অনেক উপরে উঠে আছে, যোনি পথও রক্তাক্ত।” – সাহেব আলী, সুইপার ইন্সপেক্টর, ঢাকা পৌরসভা6
৩১ ভারতের সংসদে সর্বদলীয় সম্মতিতে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে সর্বপ্রকার সহায়তা প্রদানের সংকল্প প্রকাশ করা হল।
এপ্রিল
১ “পূর্ব পাকিস্তানে স্বাভাবিক অর্থনৈতিক তৎপরতা চলছে।” – দৈনিক সংগ্রাম
২ শেখ মুজিবকে মিয়াওয়ালি কারাগারে বন্দি করা হল, আগস্টে সামরিক আদালতে বিচার শুরু হয়।
৩ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কার্যক্রম চালু হল। জামায়াতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা আবুল আলা মওদুদী আকাশবাণী, বিবিসি, ভয়েস অফ আমেরিকা ও অন্যান্য পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যমগুলোর খবরকে “মিথ্যা প্রচারণা” এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে “ইন্দো-ইসরাইলী ষড়যন্ত্র” বলে অভিহিত করেন।
৪ দিল্লিতে মিসেস গান্ধীর সাথে তাজউদ্দিন আহমেদের বৈঠক। বৈঠকে মিসেস গান্ধীকে তাজউদ্দিন জানালেন, ২৫/২৬ মার্চ তারিখে শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপ্রধান করে বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়েছে। তিনি আরো বললেন, তিনি এই সরকারের প্রধানমন্ত্রী। একই দিনে সিলেটের তেলিয়াপাড়ার চা বাগানে মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর কাজী সফিউল্লাহ, ও মেজর কাজী নূর-উজ-জামানের মত বাঙালি সামরিক কর্মকর্তারা কর্নেল আতাউল গণি ওসমানিকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করলেন। একই দিনে পিডিপি নেতা নুরুল আমিনের নেতৃত্বে ১২ জন দক্ষিণপন্থী নেতা ‘বেলুচিস্তানের কসাই’ খ্যাত টিক্কা খানের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এই প্রতিনিধি দলে অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন গোলাম আযম, মৌলভী ফরিদ আহমদ, খাজা খয়েরুদ্দিন, এ, কিউ, এম, শফিকুল ইসলাম, মাওলানা নুরুজ্জামান প্রমুখ। প্রতিনিধিদল টিক্কা খানকে “অবিলম্বে সমগ্র প্রদেশে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সামরিক আইন প্রশাসনকে সম্পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস এবং জনগণের মন থেকে ভিত্তিহীন ভয় দূর করার” উদ্দেশ্যে ঢাকায় নাগরিক কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেয়।
৫ “উর্দু, বাংলা ও ইংরেজি পাকিস্তানের এ তিনটি ভাষাতেই সাবলীল মুজিব নিজেকে নিয়ে মৌলিক চিন্তাবিদ হিসাবে ভান করতেন না। তিনি প্রকৌশলী নন, রাজনীতির কবি, তবে বাঙালিদের যেভাবেই হোক প্রযুক্তির চেয়ে শিল্পকলার প্রতি প্রবণতা বেশি, আর তাই তাঁর শৈলীই যথার্থ ছিল সেই অঞ্চলের সকল শ্রেণী ও মতাদর্শকে একতাবদ্ধ করার প্রয়োজনে।” – নিউজউইক
“পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলায় নকশালপন্থীরা প্রকাশ্যে শেখ মুজিবকে আমেরিকার দালাল ও সোভিয়েট সংস্কারবাদীদের ক্রীড়নক বলে প্রচার করছে।” - দ্য টাইম
৬ মৌলভী ফরিদ আহমদের সাথে জামায়াতপন্থীদের দ্বন্দ্বের জের ধরে গোলাম আযম একটি স্বতন্ত্র প্রতিনিধিদল নিয়ে টিক্কা খানের সাথে দেখা করেন। এই দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন পাকিস্তানের প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হামিদুল হক চৌধুরী। তিনি দক্ষিণপন্থীদের অন্তর্কলহের মীমাংসায় মুরুব্বিস্থানীয় ভূমিকা রেখেছিলেন। দৈনিক সংগ্রামের ‘ভারতের ডাইনী মায়া কান্না’ শীর্ষক সম্পাদকীয়তে দাবি করা হল, “স্বাধীন বাংলা সরকার নামে কোথাও কিছু নেই।”
৭ গোলাম আযমসহ জামায়াতে ইসলামীর প্রাদেশিক নেতৃত্ব একটি যুক্ত বিবৃতি প্রকাশ করলেন যাতে বলা হল, “পূর্ব পাকিস্তানের দেশ প্রেমিক জনগণ সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারীদের কোন স্থানে দেখামাত্র খতম করে দেবে।” বিমানে করে দুই ডিভিশন, ৯ম ও ১৬শ, সৈন্য ঢাকায় আনা হল। কুড়িগ্রাম কারারক্ষী হত্যাযজ্ঞ। কুড়িগ্রাম কারাগার থেকে কারাগারের ইনচার্জ ও দেহরক্ষীদের ধরে এনে গুলি করে মারল পাকবাহিনী।
৮ রাঙামাটিতে শহিদ হলেন বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফ। দৈনিক সংগ্রামের ‘নিজেরে হারায়ে খুঁজি’ শীর্ষক উপ-সম্পাদকীয়তে লেখা হল, “শিবাজীর স্বপ্নের ‘রামরাজ্য’ গড়তে” পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য “সর্বশক্তি নিয়োগ” করছেন মিসেস গান্ধী।
৯ শুরুতে অস্বীকৃতি জানালেও বন্দুকের মুখে টিক্কা খানকে গভর্নর হিসেবে শপথ বাক্য পাঠ করাতে বাধ্য হলেন ঢাকা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি বি. এ. সিদ্দিকী। ১৪০ সদস্যবিশিষ্ট ঢাকা নাগরিক শান্তি কমিটি আত্মপ্রকাশ করল। তবে সংবাদপত্রে এই খবর ছাপা হয় ১০ নয়, ১১ তারিখে।
দৈনিক সংগ্রামের ‘কাশ্মির থেকে পূর্ব পাকিস্তান’ শীর্ষক সম্পাদকীয়তে লেখা হল, “হিন্দুস্তান পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানদের জন্য মায়াকান্না কেঁদে ও বন্ধু সেজে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক অনুপ্রবেশে কসরত চালিয়ে যাচ্ছে। নেহেরু-তনয়া মিসেস গান্ধী মনে করছেন, তাদের এ প্রচেষ্টা সফল হলে কাশ্মীরের মত পূর্ব পাকিস্তান দখল ও সেখানে মুসলিম নিধনযজ্ঞ শুরু করা সম্ভব হবে।”
১০ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ অস্থায়ী সরকার – মুজিবনগর সরকার নামেও পরিচিত – গঠন করা হল। ঘোষণাটি প্রচার করল আকাশবানীর শিলিগুড়ি কেন্দ্র। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র রচনা, ২৬ মার্চ থেকে কার্যকর ধরে নিতে হবে।
শান্তি কমিটি গঠিত হওয়ার পরদিনই কমিটির নেতাদের মধ্যে নেতৃত্ব নিয়ে কোন্দল দেখা দিল। বিরোধীরা মৌলভী ফরিদ আহমদকে সভাপতি করে ৯ সদস্যের স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করে মূল কমিটি থেকে বেরিয়ে গেলেন। স্টিয়ারিং কমিটির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হল, “সংশ্লিষ্ট এলাকার শান্তি রক্ষা, জনগণের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা, ভারতীয় বেতারের মিথ্যা প্রচারণার স্বরূপ উন্মোচন করা, এবং ভারতীয় অনুপ্রবেশকারীদের কার্যকরীভাবে মোকাবিলা করতে জনগণকে প্রস্তুত করতে কাজ করবে এই কাউন্সিল।”
দৈনিক সংগ্রামের ‘দূরবীন’ শীর্ষক উপ-সম্পাদকীয়তে লেখা হল, “রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি হিন্দু।”
১১ দৈনিক সংগ্রামের ‘দূরবীন’ শীর্ষক উপ-সম্পাদকীয়তে লেখা হল, “কিছু সংখ্যক ব্যক্তি… পাকিস্তানের স্থলে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করে তথাকথিত বাংলাদেশ গঠনে অপপ্রয়াস পেয়েছিল।”
১২ মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত হলেন আতাউল গণি ওসমানি। দৈনিক সংগ্রাম গোলাম আযমের বেতার বক্তৃতা ছাপল। তাঁর ভাষায়, “ভারত সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারী প্রেরণ করেছে।”
১৩ চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এনলাই বললেন, “বহিরাক্রমণ থেকে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য গণচীন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
“পাকিস্তানের প্রতি চীনের দৃঢ় সমর্থন।” – দৈনিক সংগ্রাম
১৪ নাগরিক শান্তিকমিটির নাম বদলে পূর্ব পাকিস্তান কেন্দ্রীয় শান্তিকমিটি রাখা হল। ঢাকায় শান্তি কমিটির উদ্যোগে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে ভারতীয় হস্তক্ষেপের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল। এ মিছিলের পুরোভাগে ছিলেন খান এ সবুর, খাজা খয়েরউদ্দীন, মাহমুদ আলী, গোলাম আযম, শফিকুল ইসলাম, এটি সাদী, আবুল কাসেম, আব্দুল জব্বার খদ্দর, সৈয়দ আজিজুল হক, এ এস এম সোলায়মান, মেজর আফসার উদ্দিন, জুলমত আলী, বেনজির আহমদ, পীর মোহসেনউদ্দীন প্রমুখ।
দৈনিক সংগ্রাময়ের ‘ফ্যাসিবাদী ভারতের স্বরূপ’ শীর্ষক উপ-সম্পাদকীয়তে লেখা হল, “জয় বাংলা আন্দোলন বানচাল হয়ে যাও/য়ায় পূর্ব পাকিস্তানে এখন সুদিন ফিরে এসেছে।”
পানাউল্লাহরচর-আলগড়া হত্যাযজ্ঞ। ভৈরবের শিবপুর ইউনিয়নে ব্রহ্মপুত্রের তীরে পানাউল্লাহরচর-আলগড়ায় ব্রাশফায়ার করে ৫০০রও বেশি নিরস্ত্র নারী, পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করল পাকবাহিনী।
ডাক্তারপাড়া হত্যাযজ্ঞ। কুড়িগ্রাম সদরের বেলগাছা ইউনিয়নের ডাক্তারপাড়ায় ৭ জনকে হত্যা করে পাকবাহিনী।
১৫ “পূর্ব পাকিস্তানের জনতা তথাকথিত বাংলাদেশ চায় না, চায় পাকিস্তান।” – দৈনিক সংগ্রাম
১৭ মুজিবনগরে গঠিত হল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার। তাজউদ্দীন আহমদ এই সরকারের প্রধানমন্ত্রী এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রেসিডেন্ট ছিলেন। সরকারের মন্ত্রীপরিষদ সদস্যরা শপথ নিলেন।
কুমিল্লায় শহিদ হলেন বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহি মোস্তফা কামাল।
টঙ্গী আরিচপুর হত্যাযজ্ঞ। পাক সেনারা ৩০ জন গ্রামবাসীকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে।
১৮ কলকাতাস্থ পাকিস্তান কমিশনের প্রধান হোসেন আলীসহ ৬৫ জন বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন, প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ মিশন।
২০ সিলেট, ভৈরব, কসবা ও কালিগঞ্জে পাকবাহিনীর প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ। বিএসএফ ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লে. ক. মেঘ সিংসহ কয়েকজন ভারতীয় সৈন্য যশোরের নাভারনে পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন।7 বাংলাদেশের অধিকাংশ মুক্তাঞ্চলে পাকিস্তানি কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
ছাত্রলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, আ স ম আবদুর রব, ও শাজাহান সিরাজ বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) গঠন করলেন – যা মুজিব বাহিনী নামে অধিকতর পরিচিত।8
২১ জাতিসংঘে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনে বিশেষ প্রতিনিধি নিযুক্ত হলেন বিচারপতি আবু সাঈদ।
২৫ মুজিবনগর থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু হল।
৩০ বরিশালের পেয়ারাবাগানে সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে গঠিত হল পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনের জাতীয় মুক্তিবাহিনী।
মে
২ পাকিস্তান সরকার ঘোষণা করল, দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক। লাখ লাখ শরণার্থীর ভারতে আশ্রয় নেয়ার কথা অস্বীকার করা হল। লন্ডন থেকে প্রকাশিত দ্য সানডে টাইমসয়ের জন্য এক প্রতিবেদনে অ্যান্থনি মাসকারেনহাস লিখলেন, “হাজার হাজার অবাঙালি নৃশংস হত্যাযজ্ঞের শিকার... ২০,০০০ মৃতদেহ পাওয়া গেছে... তবে বাংলার প্রধান শহরগুলোতে মৃতের চূড়ান্ত সংখ্যা ১০০,০০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে।”9
৬ পাকিস্তান অভিযোগ করল, ভারত তার বিমান বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করছে, এবং সীমান্তে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে গোলাবর্ষণ করছে।
৭ পাকিস্তানে অস্ত্র রপ্তানি বন্ধের সুপারিশ করল যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটি।
১৩ তেলাং তাঙ্গা হত্যাযজ্ঞ। খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার তেলাং তাঙ্গা এলাকায় বাড়ি থেকে ধরে এনে চিত্ত রঞ্জন চাকমা, গোরাঙ্গ দেওয়ান, ও সব্যসাচী চাকমা নামের ৩ আদিবাসীকে গুলি করে হত্যা করে পাকবাহিনী।
জাতিসংঘে পাকিস্তানের দাবি, “ভারত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তা করছে।”
২০ চুকনগর হত্যাযজ্ঞ। ভদ্রা নদীর তীরে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগরে ৪-৫ ঘন্টা গুলি চালিয়ে ৬-১০ হাজার মানুষকে খুন করে পাকবাহিনী। এই হত্যাযজ্ঞে হিন্দুদের সুনির্দিষ্টভাবেই লক্ষ্য বানানো হয়েছিল, অর্থাৎ এটি ছিল পরিষ্কারভাবেই সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
২৪ ভারতে এ সময় শরনার্থীর সংখ্যা ৩৫ লাখ। ভুট্টো বললেন, “বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিতে হবে। অবৈধ ঘোষণার পর আওয়ামি লীগ জাতীয় জীবনে আর তেমন কোন শক্তি নয়।”
২৫ কলকাতার ৫৭/৮ বালিগঞ্জ সার্কুলার রোড থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সম্প্রচার শুরু হল।
জুন
২ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৩ জন শিক্ষক এক যুক্ত বিবৃতিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আচরণের প্রশংসা করেন।
৩ বরিশালের পেয়ারাবাগানে পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলনকে বিলুপ্ত করা দিয়ে তৈরি করা হল নতুন দল পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি।
৭ পরদিন (জুন ৮, ১৯৭১) থেকে পাকিস্তানের ৫০০ ও ১০০ টাকার নোট বাতিল ঘোষণা করা হল।
৯ কাঁঠালবাড়ী হত্যাযজ্ঞ। কুড়িগ্রাম শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে কাঁঠালবাড়ী বাজার ও তার আশেপাশের ৬টি গ্রামে পাকবাহিনী ও তাঁদের দালালরা ৩৫ জনকে হত্যা করে ।
৮-১০ ব্যাংকের স্বাভাবিক কাজ বন্ধ করে নোট জমা নেয়া হয়।
১২ টিক্কা খানকে যুদ্ধরত বাঙালিদের উদ্দেশ্যে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আবেদন জানালেন হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর কন্যা বেগম আখতার সোলায়মান।
১৩ দ্য সানডে টাইমসয়ে প্রকাশিত হল অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের “জেনোসাইড”, এই প্রতিবেদনটি বাংলাদেশে চলমান গণহত্যার প্রতি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে।10
১৫ ঢাকার অনেকগুলো রাস্তার নতুন নামকরণ করা হল। কয়েকটি উদাহরণ: শাঁখারি বাজার রোড হল টিক্কা খান রোড, মাদারটেক হল মাজারটেক, ইন্দিরা রোড হল আনারকলি রোড, এলিফেন্ট রোড হল আল-আরাবিয়া রোড, বেইলি রোড হল বু’আলী রোড, রায়ের বাজার হল সুলতান গঞ্জ ইত্যাদি। বছিলা গ্রামের নাম পাল্টে রাখা হল ওয়াসিলা।
১৮ সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন গভর্নর টিক্কা খান। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শরণার্থীদের দেশে ফেরার আহ্বান জানালেন। সীমান্ত পার করে যে সকল এমএনএ এবং এমপিএ ভারতে চলে গেছিলেন তাঁদের দেশে ফেরার আহ্বান জানালেন হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর কন্যা বেগম আখতার সোলায়মান।
২০ নিউজউইক পত্রিকায় সাংবাদিক টনি ক্লিফটন লিখলেন, “আমার কোন সন্দেহ নাই যে, পূর্ব পাকিস্তানের শত শত জায়গায় মাই লাই ও লিডিসের ঘটনা ঘটেছে — এবং আরো ঘটবে বলেই আমার ধারণা। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে পদকপ্রাপ্ত জনৈক অফিসার গ্যালাঘার আমাকে বলেছেন, — ‘আমি ফ্রান্সে যুদ্ধের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা — নরম্যান্ডির হননকেন্দ্র দেখেছি। — কিন্তু এগুলোর কাছে সে কিছুই নয়। কান্না চেপে আত্মসম্বরণ করতে আমাকে অনেক বেগ পেতে হয়েছিল।’”
২২ নিউ ইয়র্ক বন্দর ছেড়ে গেল আটটি বিমানসহ মার্কিন সমরাস্ত্র ভর্তি পাকিস্তান ফ্রেইটার পদ্মা ।
২৮ যুক্তরাষ্ট্র সরকার ঘোষণা দিল, অন্যান্য দেশ সাহায্য বন্ধ করলেও তাঁরা পাকিস্তানকে সহায়তা করার কর্মসূচি অব্যাহত রাখবে। ‘বিশেষজ্ঞ’দের দিয়ে নতুন সংবিধান বানিয়ে বেসামরিক প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আশ্বাস দিলেন ইয়াহিয়া। মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তিবৃদ্ধি ও নতুন করে আক্রমণ শুরু।
জুলাই
১০ বিশ্ব ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হল, পূর্ব পাকিস্তান এতটাই জর্জরিত যে অর্থনৈতিক সহায়তা গ্রহণ করার সামর্থ্য তার নেই ।
১১ কলকাতায় ৮ নং থিয়েটার রোডে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডারদের তিনদিনব্যাপী বৈঠক সম্পন্ন হয়। গঠিত হয় মুক্তিবাহিনী। নিয়মিত বাহিনীকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হল।11
১২ ইয়াহিয়া খান নিযুক্ত বিশেষজ্ঞ কমিটি প্রস্তাবিত সংবিধানে বাংলা ভাষার জন্য আরবি হরফ ব্যবহার করার সুপারিশ দেয়া হয়। সুপারিশ দেয়া হয় পাঞ্জাবকে সর্ববৃহৎ প্রদেশের মর্যাদাদানের। হিন্দুদের ভোটাধিকার বিলোপ করার সুপারিশও দেয় কমিটি।
২৯ মুক্তাঞ্চল, কলকাতা, লন্ডন ও অন্যান্য জায়গায় বাংলাদেশের ডাকটিকিট ছাড়া হলে প্রথম দিনেই কয়েক লক্ষ টাকার বিক্রি হয়।
৩১ ইয়াহিয়া বললেন, “মুজিব হিন্দুদের ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। মুজিব ৮০%-এর ওপর ভোট পেয়েছিলেন। কোনো মতেই ১০%-এর বেশি ভোটার ছিল না।”
আগস্ট
১ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে আয়োজিত হল কনসার্ট ফর বাংলাদেশ।12
৫ পূর্ব পাকিস্তান সংকট নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশ করল পাকিস্তান।
৭ জাতীয় পরিষদ থেকে আওয়ামি লীগের ৭৯ জনের সদস্যপদ বাতিল করা হল।
৯ ভারত আর সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে বিশ বছর মেয়াদী শান্তি, মৈত্রী, ও সহযোগিতা চুক্তি সই হল।
১৪ বালাবাড়ী হত্যাযজ্ঞ। কুড়িগ্রাম জেলার বালাবাড়ীতে ১৩ জন গ্রামবাসীকে হত্যা করে পাকবাহিনী।
১৫ অপারেশন জ্যাকপট।
১৬ শেখ মুজিবের পক্ষে হামলা চালানোর জন্য এ কে ব্রোহি এবং তাঁর সহকারী গোলাম আলী মেনন, আকবর মির্জা ও গোলাম হোসেনকে অনুমতি দিল পাকিস্তান সরকার। কুঁড়িঘাট হত্যাযজ্ঞ। কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে পাকবাহিনী রাজাকারদের সহায়তায় ১৫০ জনকে খুন করে, অধিকাংশই হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ।
১৮ পাকিস্তানিদের হাতে শহিদ হলেন পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি থেকে বহিষ্কৃত মুক্তিযোদ্ধা ফিরোজ কবির। আগস্ট মাসেই সাভারে পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির উর্দুভাষী মুক্তিযোদ্ধা সামিউল্লাহ আজমীকে কৌশলে আলোচনার নামে ডেকে নিয়ে হত্যা করল আওয়ামী লীগাররা। সর্বহারারা পাকিস্তান আর ভারত উভয় রাষ্ট্রকেই দখলদার হিসেবে দেখতেন বলে তাঁরা পাক বাহিনী ও ভারত-সমর্থিত মুক্তিবাহিনী উভয়ের সাথে এক অসম লড়াইয়ে লিপ্ত হয়েছিলেন।
২১ পাকিস্তানের করাচিতে শহিদ হলেন বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান।
২৯ মগবাজারে শহিদ হলেন বীরবিক্রম আব্দুল হালিম চৌধুরী।
সেপ্টেম্বর
৫ যশোরে শহিদ হলেন বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ।
৮ আওয়ামি লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি, দুই ন্যাপ, ও কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে গঠিত হল জাতীয় উপদেষ্টা কমিটি।
১১ জাতীয় পরিষদ সদস্য এনায়েত হোসেন খানের সভাপতিত্বে খন্দকার মোশতাক আহমেদ, শেখ মণি, আবদুর রব সেরনিয়াবাত প্রমুখের সমর্থকদের সভায় তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী ও দলের সাধারণ পদ থেকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে বাধ্য করার জন্য আওয়ামি লীগ হাই কমান্ডের প্রতি আহ্বান জানাল। খন্দকার বাড়ির হত্যাযজ্ঞ। কুমিল্লার আমড়াতলি ইউনিয়নের ধনঞ্জয় গ্রামের খন্দকার বাড়িতে আশ্রয় নেয়া ২৬ জনকে ঘরের দরজা ভেঙে খুন করল পাকবাহিনী।
১৭ ঢাকায় শপথ নিলেন মালেক মন্ত্রিসভার ৯ সদস্য।
১৮ নয়া দিল্লিতে দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক বাংলাদেশ সম্মেলন শুরু।
২১ উপনির্বাচনের নতুন তারিখ ঘোষণা করা হল। ২০-২১ অক্টোবর মনোনয়নপত্র দাখিল। ভোট গ্রহণ ১২-২৩ ডিসেম্বর।
২৫ চট্টগ্রামের নাপোড়া পাহাড় গ্রামে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির (মার্কসবাদী লেনিনবাদী) [ইপিসিপি-এমএল] ১৫ জন কর্মীকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করল বিএলএফ, পরবর্তীতে মুজিববাহিনী।
২৮ ভারতের ডিমাপুরে গঠিত হল বাংলাদেশ বিমান বাহিনী।
২৯ ভারত-সোভিয়েত যুক্ত ইশতেহার।
অক্টোবর
৬ সাপ্তাহিক জয়বাংলার প্রতিনিধিকে তাজউদ্দীন আহমদ বললেন, “বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আমি পূর্ণবার দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে ঘোষণা করতে চাই যে, আমাদের সরকারের চারদফা পূর্বশর্ত — বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি, বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিনাশর্তে মুক্তি, বাংলাদেশ থেকে সমস্ত পাকিস্তানি সৈন্য প্রত্যাহার এবং বাংলাদেশে ইয়াহিয়াবাহিনীর ধবংসলীলার পূর্ণ ক্ষতিপূরণ না হওয়া পর্যন্ত কারো সাথে আলাপের প্রশ্নই ওঠে না।”
১০ প্যারিসে গভীর রাতে অধ্যয়নরত অবস্থায় মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়ে মারা গেলেন কথাসাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্।
১২ দিল্লিস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে জানালেন যে, ভারত যদি মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করা থেকে বিরত না হয়, পাকিস্তান পশ্চিম দিক থেকে ভারত আক্রমণ করবে।
১৩ বড়ইতলা হত্যাযজ্ঞ। কিশোরগঞ্জে ৩৬৫ জন গ্রামবাসীকে খুন করে পাকবাহিনী। গুপ্তঘাতকের গুলিতে প্রাক্তন গভর্নর মোনেম খাঁর মৃত্যু।
১৮ পাক-ভারত সীমান্ত থেকে উভয় পক্ষের সেনা প্রত্যাহারের আহ্বান জানালেন মস্কোস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত।
২০ ভারত ও যুগোস্লাভিয়ার এক যুক্ত ইশতেহারে বাংলাদেশ সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের প্রস্তাব দেয়া হল। উপমহাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য শেখ মুজিবকে মুক্তি দেয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করলেন মার্শাল জোসিপ ব্রজ টিটো। সীমান্ত বরাবর জাতিসংঘ পর্যবেক্ষক দল নিয়োগের প্রস্তাব দিলেন জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট।
২১ সেনা প্রত্যাহার ও জাতিসংঘ পর্যবেক্ষক দল নিয়োগের প্রস্তাবে সম্মতি দিলেন ইয়াহিয়া।
২৪ ভারতের শরণার্থী সমস্যা ও বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারতের অবস্থান ব্যাখ্যা করার উদ্দেশ্যে পশ্চিম ইওরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে ১৯ দিনের সফরে বের হলেন ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধী।
২৫ শংকর মাধবপুর হত্যাযজ্ঞ। কুড়িগ্রামের চর রাজীবপুর উপজেলার কোদালকাঠি ইউনিয়নের শংকর মাধবপুর গ্রামে ৪৩ জন গ্রামবাসীকে হত্যা করে পাকবাহিনী।
২৮ সিলেটে শহিদ হলেন বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান।
নভেম্বর
১ উপনির্বাচনে ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টির ৫ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলেন।
৩ সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎ স্টেশনের ৪টি জেনারেটরের মধ্যে ৩টি মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা ধ্বংস হওয়ার ফলে ঢাকার ৩০ মাইলের মধ্যে সব শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেল। চট্টগ্রামে একটা বড় তেলের ট্যাঙ্কার ডুবিয়ে দেয়া হল।
৫ ভুট্টোর নেতৃত্বে পাকিস্তানের তিন বাহিনী প্রধান সহ ৮ জনের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল বেইজিং সফর করল।
৭ ভুট্টো ফিরে এসে জানালেন, তাঁর মিশন সফল হয়েছে, গণচীনের সমর্থন পাবে পাকিস্তান।
৮ প্যারিসে ইন্দিরা বললেন, “পূর্ববাংলার একমাত্র সমাধান স্বাধীনতা, শীঘ্রই হোক আর দেরিতেই হোক এ স্বাধীনতা আসবেই।”
১৩ দাগারকুটি হত্যাযজ্ঞ। কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের দাগারকুটি এলাকায় ৬৯৭ জনকে খুন করে পাকবাহিনী। তবে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের সংগ্রহ করা তথ্যে বলা হয়েছে, শহিদের সংখ্যা ৭৬৪ জন।
১৬ হাসনাবাদ হত্যাযজ্ঞ। কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার হাসনাবাদে পাকবাহিনী ২৯ জনকে হত্যা করে মাটি চাপা দিয়ে রাখে।
দিল্লিতে কংগ্রেসের কার্যনির্বাহী দলের বৈঠকে ইন্দিরা বললেন, “দু এক মাস কিংবা তারও আগে বাংলাদেশ সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করা যায়। তবে আমরা সর্বত্র চেষ্টা করে যাচ্ছি। বাংলাদেশের শরণার্থীরা শিগগির তাদের স্বদেশে ফিরে যাবে।”
তাজউদ্দীন আহমদ ও সৈয়দ নজরুল ইসলামের সাথে সাক্ষাৎ করলেন ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধী।
১৭ ঢাকায় অনির্দিষ্টকালের জন্য সান্ধ্য আইন জারি হল ।
১৮ নীলুর খামার হত্যাযজ্ঞ। কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার নীলুর খামার গ্রামে ৭৯ জনকে খুন করে পাকবাহিনী।
ভারতের প্রেসিডেন্ট ভি ভি গিরি বললেন, “ভারত এখন ধৈর্যের শেষ সীমানায়।”
২১ বয়রা-চৌগাছা সীমান্তে ভারত ও পাকিস্তানের ট্যাঙ্ক, বিমান ও গোলন্দাজ সংঘর্ষ।
২৩ এক বেতার ভাষণে তাজউদ্দীন আহমদ বললেন, “মুক্তিবাহিনী এখন যে কোন সময়ে, যে কোন জায়গায় শত্রুকে আঘাত করতে পারে।” ইন্দিরাকে দেয়া এক চিঠিতে মুজিবনগর সরকার ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি চাইল। একইদিনে পাকিস্তানে জরুরী অবস্থা জারি করা হল।
২৮ নগরীপাড়া হত্যাযজ্ঞ। কুমিল্লার লাকসাম থানার মুদাফফরগঞ্জের নগরীপাড়ায় ৫ পরিবারের ১০ জনকে খুন করে পাকিস্তানি ও রাজাকাররা। অন্যান্য লাশের সাথে ভুবন চন্দ্র কর্মকারকে জ্যান্ত মাটি চাপা দেয়া হয়।
ডিসেম্বর
২ প্রেসিডেন্ট নিক্সনের কাছে একটা চিঠি দিলেন ইয়াহিয়া।
৩ ভারতে বাংলাদেশি শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি। কাশ্মির নিয়ে তৃতীয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সার্থক হামলায় নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ও চট্টগ্রামের ফুয়েল পাম্প ক্ষতিগ্রস্ত।
৪ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্র অবিলম্বে যুদ্ধ বিরতি এবং ভারত পাকিস্তান উভয় পক্ষের সেনা প্রত্যাহারের একটি প্রস্তাব দিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন এই প্রস্তাবে ভেটো প্রদান করে। ফ্রান্স আর ব্রিটেন ভোটদানে বিরত থাকে।
৫ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সোভিয়েত ইউনিয়নের দেয়া প্রস্তাবে বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তানে এমন রাজনৈতিক নিষ্পত্তি প্রয়োজন যার অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে বর্তমান সংঘর্ষের অবসান ঘটবে। গণচীন এই প্রস্তাবে ভেটো প্রদান করে। অন্যরা ভোটদানে বিরত থাকে।
৬ প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিল ভারত। পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তানের বিমান তৎপরতা সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত।
৭ দ্বিতীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিল ভুটান। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি চুক্তি সই হয়, যার মধ্য দিয়ে মুক্তিবাহিনী ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের অধিনায়ক লে. জে. জগজিৎ সিং অরোরার কমান্ডের অধীনস্ত হল, ঠিক হল অরোরা জেনারেল মানেকশর মাধ্যমে উভয় দেশের সরকারের কাছে প্রতিবেদন প্রেরণ করবেন। যশোর মুক্ত হল।
৮ ভারতের সরকারি মুখপত্র ঘোষণা করলেন, পাকিস্তান যদি বাংলাদেশে তাদের পরাজয় স্বীকার করে নেয়, তবে সকল অঞ্চলেই ভারত যুদ্ধ বন্ধ করবে।
৯ মেঘনার পূর্বদিকে সকল অঞ্চল মুক্ত হল। সপ্তম নৌবহরকে বঙ্গোপসাগরের দিকে যাত্রা করার হুকুম দিলেন প্রেসিডেন্ট নিক্সন।
১০ খুলনায় শহিদ হলেন বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমীন। মালাক্কা প্রণালির পুবদিকে অবস্থান করছিল সপ্তম নৌবহর। সিকিম-ভুটান সীমান্তে চীনা সেনাবাহিনীর তৎপরতা। হেলিকপ্টার যোগে রায়পুরায় অবতরণ করল ভারতীয় বাহিনী। ঢাকায় সামরিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর ক্রমাগত ভারতীয় আক্রমণ।
১১ কাদের সিদ্দিকী নিয়ন্ত্রিত মধুপুর এলাকায় অবতরণ করলেন ভারতীয় প্যারাট্রুপারদের ৭০০ সৈন্য। পাকিস্তানিদের সাথে সংঘাত। চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ও উপকূলীয় অবকাঠামো, জাহাজ, নৌযান ইত্যাদি সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করার জন্য ভারতীয় নৌবাহিনীর বিমান ও যুদ্ধ জাহাজের তৎপরতা।
১২ নরসিংদী মুক্ত হল। বিকালে চীনা প্রতিনিধি হুয়াং হুয়া নিউ ইয়র্কে আলেকজান্দার হেগকে জানালেন, চীন কেবল আরেকবার যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে আগ্রহী, উপমহাদেশে সামরিক হস্তক্ষেপ করার বিষয়ে নয়। বঙ্গোপসাগর থেকে মাত্র ২৪ ঘন্টার দূরত্বে সপ্তম নৌবহরের নিশ্চল অবস্থান।
১৩ নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তৃতীয় সোভিয়েত ভেটো।
১৪ পাকিস্তানি সেনাকর্মকর্তা রাও ফরমান আলির পরিকল্পনায় আলবদর বাহিনীর হাতে সংঘটিত হল বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড। এদের মধ্যে অন্যতম – আনোয়ার পাশা, মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, সেলিনা পারভিন, আলিম চৌধুরী, ফজলে রাব্বী, শহিদুল্লাহ কায়সার প্রমুখ। মহানন্দার চরে শহিদ হলেন বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর।
১৫ সন্ধ্যায় দক্ষিণ, পূর্ব, পূর্ব-উত্তর, ও উত্তর দিক থেকে ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ বাহিনী ঢাকার উপকন্ঠে সমবেত হল। নিয়াজির অনুরোধে এই দিন বিকাল ৫.৩০ থেকে পরদিন সকাল ৯টা পর্যন্ত বিমান হামলা স্থগিত। ভারত মহাসাগরে অবস্থান নিল ২০টি সোভিয়েত রণতরী।
১৬ সকাল ১০.৪০য়ে মিত্রবাহিনী ঢাকায় প্রবেশ করে। বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ প্রান্তে প্রবেশ করল সপ্তম নৌবহর। বিকাল ৫টা ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে মিত্রবাহিনীর কাছে পাকিস্তানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সমাপ্তি।13
১৭ সিলেট মুক্ত হল।
১৮ রায়েরবাজারে শহিদ বুদ্ধিজীবীদের বধ্যভূমি আবিষ্কৃত হয়। একইদিনে ঢাকায় দালালির দায়ে অভিযুক্ত কয়েকজন উর্দুভাষীকে প্রকাশ্যে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে খুন করেন কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান আবদুল কাদের সিদ্দিকী ও তাঁর অনুসারীরা। কাছাকাছি সময়েই কখনো সিদ্দিকী টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনী স্কুলের মাঠে প্রকাশ্য দিবালোকে পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির সদস্য ও বামপন্থী মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলামকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে খুন করেন।
১৯ যৌথবাহিনী প্রধান লে. জে. জগজিৎ সিং বললেন, “ভারতীয় বাহিনী প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় বাংলাদেশে অবস্থান করবে না।”
২০ পাকিস্তানের নতুন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ভুট্টো বললেন, “পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তানের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। অখণ্ড পাকিস্তানের কাঠামোর অধীনে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার জন্য মিলিত হতে রাজি।” প্রদেশ ও কেন্দ্রের তহবিল একীভূত করল বাংলাদেশ সরকার।
২১ ভুট্টো ঘোষণা দিলেন, শেখ মুজিবকে শিগগিরই জেল থেকে মুক্তি দিয়ে অন্য কোথাও গৃহবন্দী করা হবে। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার লক্ষ্যে শেষ মুহূর্তে ১০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ নোট জ্বালিয়ে দিল। নাটোরে পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করে। দেশের ডাকব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ডাকব্যবস্থা চালু হল। সর্বদলীয় সরকার গঠনের আহবান জানালেন ন্যাপ-মোজাফফর প্রধান।
২২ পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন শেখ মুজিব। তাঁকে অনতিবিলম্বে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। মুজিবনগর থেকে ঢাকায় ফেরার পর অস্থায়ী সরকারের প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সহ বাংলাদেশ সরকারের নেতারা সংবর্ধনা পেলেন।
২৩ যুদ্ধ শেষে ১৮ তারিখে লালবাগ থানায় আত্মসমর্পণ করেছিলেন যুদ্ধকালে পাকিস্তানের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রাখা মৌলভী ফরিদ আহমদ। মুজিব বাহিনীর সদস্যরা তাঁকে ছিনিয়ে নেন এবং ইকবাল হলে টানা ৫ দিন আটক রাখেন ও জিজ্ঞাসাবাদ করেন। ২৩ তারিখে সলিমুল্লাহ হলের পেছনে তাঁর লাশ পাওয়া যায়।
মন্ত্রিপরিষদের প্রথম বৈঠকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করা হয়। স্টেট ব্যাংকের নাম বদলে রাখা হয় বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রেস ট্রাস্ট বিলুপ্ত।
যুদ্ধকালে অনুষ্ঠিত সব পরীক্ষার ফল বাতিল করা হল।
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত ডি পি ধর বললেন, “ভারত বাংলাদেশের বিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সব ধরণের সহায়তা দেবে।”
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদ ঘোষণা করলেন, “ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক উত্তরোত্তর ঘনিষ্ঠ হবে।”
দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানালেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ।
চীন বাংলাদেশে চীনা দূতাবাসের কার্যক্রম বন্ধ করল।
২৪ মালেক মন্ত্রিসভার এম. এ. মালেক সহ অন্যান্য সদস্যকে যুদ্ধকালে পাকিস্তানের দালালির অভিযোগে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হল। বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের তদন্তের দাবি তুললেন ৫২ জন বুদ্ধিজীবী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ. এইচ. এম. কামরুজ্জামান বললেন, “যুদ্ধাপরাধীরা বিচারের হাত থেকে বাঁচতে পারবে না।”
২৫ প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ঘোষণা করলেন, “মুক্তিবাহিনীকে নিরস্ত্র করার প্রশ্ন আসে না। যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতামতের ওপর ভারত কোন ভূমিকা রাখবে না।” পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদ ঘোষণা দিলেন, “বাংলাদেশ জোটনিরপেক্ষ স্বাধীন বৈদেশিক নীতি গ্রহণ করবে।”
২৬ ঢাকা ও কলকাতার মধ্যে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের বাণিজ্যিক ফ্লাইট শুরু হল। সিদ্ধান্ত নেয়া হল, সরকার একটি জাতীয় মিলিশিয়া বাহিনী গঠন করবে, তালিকাভুক্ত ও তালিকাবিহীন সকল মুক্তিযোদ্ধা যাতে থাকবেন। সরকার শত্রু সম্পত্তি হিসেবে সকল পাটকল ও শিল্পকারখানা অধিগ্রহণ করবে। অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট কর্তৃক ঘোষিত হল বাংলাদেশ অর্ডার (ট্যাক্স)। পরবর্তী বাংলা নববর্ষ থেকে ২৫ বিঘা পর্যন্ত আবাদি জমির খাজনা মকুব ঘোষণা করা হল।
২৭ পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীকে সহায়তা করার দায়ে হাসান জামান সহ আরও ৩৩ জন গ্রেপ্তার। মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন ফণিভূষণ মজুমদার, জহুর আহমেদ চৌধুরী, ও আব্দুস সামাজ আজাদ।
২৮ কেবিনেট সদস্য হিসেবে শপথ নিলেন প্রফেসর ইউসূফ আলী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, সোভিয়েত জনগণের বাংলাদেশে আসার জন্য ভিসা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড তদন্তের জন্য কমিশন গঠনের আহবান জানালেন কথাসাহিত্যিক ও ফিল্মমেকার জহির রায়হান।
২৯ মন্ত্রীদের দায়িত্ব বন্টন করা হল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেলেন আব্দুস সামাদ আজাদ।
৩১ ১৯৫৯ সালে চালু করা বোনাস ভাইচার প্রথা বিলুপ্ত। খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য একটি খাদ্য কমিশন গঠন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হল।
ডিসেম্বরের শেষ দিকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর লুটপাটের বিরোধিতা করে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে গ্রেপ্তার হলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার এম এ জলিল।
তথ্যসূত্র
টাবী, আলী আকবর। ২০১৮। দৈনিক সংগ্রাম: মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকা। তৃতীয় সংস্করণ। এবং মানুষ।
পারভেজ, আলতাফ। ২০১৫। মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী: ইতিহাসের পুনর্পাঠ। ঐতিহ্য।
প্লেটো, মুজতবা হাকিম। সাল দেয়া নেই। বধ্যভূমির গদ্য। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ভার্চুয়াল আয়োজন।
রহমান, মুহাম্মদ হাবিবুর। ২০০৮। বাংলাদেশের তারিখ। তৃতীয় সংস্করণ। মাওলা ব্রাদার্স।
শরীফ, ড: আহমদ, নূর-উজ্জামান, কাজী, ও কবির, শাহরিয়ার (সম্পাদিত)। ১৯৯২। একাত্তরের ঘাতক ও দালালেরা কে কোথায়। চতুর্থ সংস্করণ পঞ্চম মুদ্রণ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশ কেন্দ্র।
Aziz, Qutubuddin. 1974. Blood and Tears: 170 Eye-witness Accounts of the Atrocities Committed on West Pakistanis, Biharis and Other Non-Bengalis and pro-Pakistan Bengalis in 55 towns of East Pakistan by Awami League militants and other rebels in March-April, 1971. Publications Division, United Press of Pakistan.
Bass, G. J. 2013. The Blood Telegram: Nixon, Kissinger, and a Forgotten Genocide. Alfred A. Knopf.
Dasgupta, Chandrashekhar. 2021. India and the Bangladesh Liberation War. Juggernaut Books
Khasru, B. Z. 2021. Myths and Facts: Bangladesh Liberation War: How India, U.S., China, and the U.S.S.R Shaped the Outcome. Second impression. Rupa.
Majumdar, Ushinor. 2023. India’s Secret War: BSF and Nine Months to the Birth of Bangladesh. Penguin Random House India.
Maniruzzaman, Talukder. 1975. Radical Politics and the Emergence of Bangladesh. Bangladesh Books International.
Mookherjee, Nayanika. 2015. The Spectral Wound: Sexual Violence, Public Memories and the Bangladesh War of 1971. Duke University Press.
Raghavan, Srinath. 2013. 1971: A Global History of the Creation of Bangladesh. Harvard University Press.
Rashid, Azra. 2019. Gender, Nationalism, and Genocide in Bangladesh: Naristhan/Ladyland. Routledge.
Saikia, Yasmin. 2011. Women, War, and the Making of Bangladesh: Remembering 1971. Duke University Press.
Sen, Sumit. 1999. “Stateless Refugees and the Right to Return: The Bihari Refugees of South Asia Part 1.” International Journal of Refugee Law Volume 11, Issue 4, Pages 630–631. https://doi.org/10.1093/ijrl/11.4.625
Sisson, Richard, and Rose, Leo E. 1991. War and Secession: Pakistan, India, and the Creation of Bangladesh. University of California Press.
Wikipedia.
Zakaria, Anam. 2019. 1971: A People’s History from Bangladesh, Pakistan, and India. Penguin Random House.
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে বাম রাজনীতির ভূমিকা সম্পর্কে জানতে, দেখুন, (Maniruzzaman 1975)।
পরবর্তীকালে যশোর, খুলনা, রংপুর, দিনাজপুরে ও সৈয়দপুরে উর্দুভাষীরা বাঙালিদের হাতে হত্যাযজ্ঞের শিকার হন। Aziz (1974) দাবি করেছেন, মার্চ-এপ্রিল জুড়ে পূর্ব পাকিস্তানের ৫৫টা শহরে এ ধরণের ঘটনা ঘটেছিল। অনেকে এই বিহারি হত্যাযজ্ঞের দোহাই দিয়ে বাঙালি জেনোসাইডের পক্ষে সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করেন, যদিও আন্তর্জাতিক আইনে এভাবে জেনোসাইডকে বৈধতা দেয়ার কোন সুযোগ নেই।
লেখক সংগ্রাম শিবিরের আহবায়ক হাসান হাফিজুর রহমান। এর সদস্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য: আবদুল গনি হাজারি, আবদুল গাফফার চৌধুরী, আহমদ শরীফ, জহির রায়হান, বদরুদ্দীন উমর, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, রণেশ দাশগুপ্ত, রোকনুজ্জামান খান, শওকত ওসমান, শামসুর রাহমান, সাইয়ীদ আতিকুল্লাহ্, সিকানদার আবু জাফর, সুফিয়া কামাল প্রমুখ। স্বাধিকার আন্দোলনের উত্তাপে গঠিত হয়েছিল এই কমিটি।
যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে এই গানের প্রথম দশ চরণকে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। গানটি গগণ হরকরার আমি কোথায় পাব তারে গানের সুর ভেঙে লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। স্বদেশী আন্দোলনের প্রেক্ষিতে লেখা হয়েছিল।
পাকিস্তান রাষ্ট্র কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের নিরস্ত্র অধিবাসীদের ওপর পূর্বপরিকল্পিত জেনোসাইডের শুরুয়াত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসএম হল, সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, আর জগন্নাথ হলের অসংখ্য আবাসিক ছাত্রকে খুন করে পাকিস্তানিরা। এ রাতে শহিদ হন অধ্যাপক গোবিন্দ চন্দ্র দেব, অধ্যাপক এম মুনিরুজ্জামান, অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক। বস্তিতে যেমন আগুন ধরানো হয়, পত্রিকা অফিসেও। দৈনিক সংবাদ অফিসে ঘুমাচ্ছিলেন মানসিকভাবে অসংলগ্ন হয়ে পড়া কথাসাহিত্যিক শহীদ সাবের, পাকিস্তানিদের দেয়া আগুনে পুড়ে মারা যান। শেখ মুজিব পাকিস্তানিদের হাতে গ্রেপ্তার, আওয়ামী লীগের অবশিষ্ট নেতৃত্ব ভারতে আশ্রয় নিলেন। পূর্ব পাকিস্তান কার্যত পাকিস্তানের হাতছাড়া হয়ে গেল।
দুনিয়ার আর সব যুদ্ধের মত আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধেও বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক নারী বীভৎস ধর্ষণ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিন্তু এই প্রসঙ্গটি জাতীয়তাবাদী জজবা তৈরিতে যতটা ব্যবহৃত হয়েছে, নারীদের নিজেদের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা ততটা মূল্য পায়নি। বিস্তারিত জানতে, দেখুন, (Saikia 2011; Mookherjee 2015; Rashid 2019).
যুদ্ধকালে বিএসএফের ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে, দেখুন, (Majumdar 2023)।
ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রয়ের (রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং) মেজর জেনারেল সুজন সিং উবানের তত্ত্বাবধানে মুজিব বাহিনীকে গড়ে তোলা ও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল। এই বাহিনী সম্পর্কে মুজিবনগর সরকারের কর্তাব্যক্তিরা শুরুতে কিছুই জানতেন না, এদের নিয়ন্ত্রণ ছিল সরাসরি ভারত রাষ্ট্রের হাতে। মুজিব বাহিনী সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে, দেখুন, (পারভেজ ২০১৫)।
যুদ্ধকালে উর্দুভাষীরা যে হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, সে সম্পর্কে জানতে, দেখুন, (Aziz 1974; Sen 1999).
জেনোসাইডের জন্য মাসকারেনহাস সঠিকভাবেই পাকিস্তানকে দায়ী করেছেন; তবে যুদ্ধকালে এক শ্রেণির বাঙালিদের হাতে উর্দুভাষীরাও যে খুন-ধর্ষণ-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন; প্রতিবেদনে সে প্রসঙ্গও এসেছে।
নিয়মিত বাহিনীর মধ্যেই কেএম শফিউল্লাহ, খালেদ মোশাররফ, ও জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে যথাক্রমে এস-ফোর্স, কে-ফোর্স, ও জেড-ফোর্স নামে তিনটি বিশেষ বাহিনী গড়ে তোলা হয়। ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের নিয়ে অনিয়মিত গণ বাহিনী গড়ে তোলা হয়। মূলধারার বাইরে বিশেষত বামপন্থীরা স্বতন্ত্রভাবে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, এঁদের কেউ কেউ পাক বাহিনীর পাশাপাশি মুজিব বাহিনীর বিরুদ্ধেও লড়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বহু বিবেকবান মানুষ বাংলাদেশের পক্ষে ছিলেন। তবে, যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রশাসন পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। যুদ্ধকালে নিক্সন ও কিসিঞ্জারের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে, দেখুন, (Bass 2013)।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিছকই বাংলাদেশের ব্যাপার ছিল না। এই যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণে অভ্যন্তরীণ মুক্তিসংগ্রামের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। মুক্তিযুদ্ধে পরাশক্তিগুলোর ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে, দেখুন, (Sisson & Rose 1991; Raghavan 2013; Khasru 2021; Dasgupta 2021).


