ফিলিস্তিন: এক রাষ্ট্রহীন জাতির হাজার বছরের ইতিহাস
Article
Map: World Maps in Bangla.
ভূমিকা
“From womb to tomb, we are bound to others, past and present, and by each crime and every kindness, we birth our future.”
David Mitchell, Cloud Atlas
অক্টোবর ৭, ৩৭৬১ পূর্বসাল।
দিনটি ইহুদি পঞ্জিকার প্রথম দিন বলে বিবেচিত। দ্বিতীয় শতাব্দীর এক ইহুদি রাব্বি ইয়োসে বেন হালাফতা বাইবেল ঘেঁটে দাবি করেছিলেন, এই দিনেই নাকি পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে (Green 2015)। তাঁর এই অদ্ভুত দাবি প্রমাণ করার কোন উপায় না থাকলেও ২০২৩ সালে এই দিনটিতেই হামাস ইসরায়েলে হামলা চালিয়েছিল।
কিন্তু পৃথিবী যেদিনই সৃষ্টি হোক, ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকট অক্টোবর ৭ হামলার মাধ্যমে শুরু হয়নি। এর এক দীর্ঘ ও করুণ ইতিহাস আছে। এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য সংক্ষেপে সেটি তুলে ধরা।
ফিলিস্তিন বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও রক্তাক্ত ভূখণ্ড। যার ভূগোল, ধর্ম ও সংস্কৃতি একদিকে পশ্চিম এশিয়ার ইতিহাসে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। অন্যদিকে প্রায়ই যার ভাগ্য নির্ধারণ করেছে বহির্শক্তি।
ফিলিস্তিনিরা এক রাষ্ট্রহীন জাতি। রাষ্ট্রহীনতা যাঁদের জন্য নেহাতই রাজনৈতিক সংকট নয়। একইসাথে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও অস্তিত্ব সংকটও বটে।
আধুনিক ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকটের প্রকৃতি বুঝতে হলে কেনানীয় পৌত্তলিকতা থেকে গাজা জেনোসাইড পর্যন্ত ফিলিস্তিনের ইতিহাসটা সংক্ষেপে জানা জরুরি।
চলুন, শুরু করি।
প্রাচীন ফিলিস্তিন: কেনানীয় বহুদেবতাবাদ থেকে ইব্রাহিমি একেশ্বরবাদ
“Phoenicia and Palestine will for ever live in the memory of mankind.”
Edward Gibbon
প্রাচীন ফিলিস্তিন ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। যা বিভিন্ন সভ্যতার সংযোগস্থল বলে বিবেচিত হত। গাজার দক্ষিণ প্রান্তে কাতিফের প্রত্নস্থানে ৪৫০০–৪০০০ পূর্বসালের মানব বসতির নিদর্শন পাওয়া গেছে। যা এই অঞ্চলে প্রাচীনকালে মা্নুষের উপস্থিতির প্রমাণ (রাফিন ২০২৩)। এ সময়ে অঞ্চলটিতে বহু গোত্রের বসবাস ছিল। যাঁরা প্রাথমিক ধাঁচের কৃষি, পশুপালন এবং স্থানীয় নদী ও উপকূলীয় জলপথে বাণিজ্য করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এভাবেই এই অঞ্চলের প্রথম সমাজগুলো গড়ে ওঠে।
ফিলিস্তিনে ব্রোঞ্জ যুগে (৩৫০০–১২০০ পূর্বসাল) কেনানীয় রাজ্যগুলোর উত্থান ঘটে। প্রাচীন কেনানের ধর্ম ছিল বহুদেবতাবাদী, যেখানে প্রকৃতি ও উর্বরতার সাথে যুক্ত দেবদেবীরা গুরুত্ব পেতেন। প্রধান দেবতা এলকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে দেখা হত। বা’আল ছিলেন ঝড় ও উর্বরতার দেবতা, যিনি কৃষিকাজের জন্য অপরিহার্য বলে বিবেচিত হতেন। আশেরাহ দেবী মাতৃত্ব ও উর্বরতার প্রতীক হিসেবে পূজিত হতেন, যাঁকে প্রায়ই সৃষ্টিকর্তা এলের স্ত্রী হিসেবে দেখা যেত (Day 2002)। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, যেমন মূর্তি ও মন্দির, প্রমাণ করে কেনানীয়রা তাদের ধর্মীয় আচারঅনুষ্ঠানে দেবদেবীদের সাকার রূপ ব্যবহার করতেন (Tubb 1998)। কেনানীয় ধর্মের সাথে কৃষিকাজ গভীরভাবে সম্পর্কিত ছিল, যেখানে দেবতাদের সন্তুষ্ট করা বৃষ্টিপাত, ফসল উৎপাদন ও জীবনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিতকরণের উপায় ভাবা হত।
১৮০০ পূর্বসালে ইব্রাহিম নবি তাঁর জন্মভূমি উর ছেড়ে কেনানে চলে আসেন। এ সময়টি ছিল ইব্রাহিম, ইসহাক, ও ইয়াকুবের মত গোত্রপিতাদের যুগ। এর কয়েকশো বছর পর মুসা নবীর নেতৃত্বে ইহুদিরা ফেরাউনের মিসর থেকে মুক্তি পান। এরপর যাযাবরের মত সিনাই উপত্যকায় ঘুরতে ঘুরতে শেষে জোশুয়ার নেতৃত্বে জয় করেন কেনান। কেনানীয় বহুদেবতাবাদীদের ওপর একটা ভয়ংকর হত্যাযজ্ঞ চালান। ১০০৪/১০০৩ পূর্বসালে রাজা দাউদ জেরুসালেমে তাঁর রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। ৯৬১-৯২৮ পূর্বসালের মধ্যে কখনো দাউদের পুত্র রাজা সোলেমান নির্মাণ করেন জেরুসালেমের প্রথম মন্দির। ৫৮৭/৫৮৬ সালে বাবেলীয়রা জেরুসালেমের প্রথম মন্দির ধবংস করে দেয় এবং স্থানীয় ইহুদিদের এক-তৃতীয়াংশকে বাবেলে নির্বাসিত করে। বাবেলের বন্দীদশায় ইহুদিদের মধ্যেমসীহ ধারণার বিকাশ ঘটে। শব্দটির মানে ত্রাণকর্তা। এসময় থেকেই ইহুদিরা বিশ্বাস করতে শুরু করেন; একজন মসীহ আসবেন, এবং তাঁদের সব দুঃখদুর্দশার অবসান ঘটাবেন। ৫৩৯ সালে পারস্যের খসরু ইহুদিদের মুক্ত করেন। ৫২০-১৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ইহুদিরা জেরুসালেমে ফিরে আসেন। ৫১৬/৫১৫ সালে জেরুসালেমে নির্মিত হল ইহুদিদের দ্বিতীয় মন্দির। পূর্বসাল ৬-৩০ সালে কখনো বর্তমান ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের শহর বেথলেহেমে জন্ম নেন ঈসা নবি। ৭০ সালে রুমিদের হাতে ধবংস হয় জেরুসালেমের দ্বিতীয় মন্দির। এই ধবংসযজ্ঞে নেতৃত্ব দেন সম্রাট ভেসপাসিয়ানের পুত্র ও রোমের সাম্রাজ্যিক সেনাবাহিনীর অধিনায়ক টাইটাস (রাফিন ২০২৩)।
বাইবেলে কেনানীয় বহুদেবতাকে প্রচণ্ড নিন্দা করা হয়েছে। যদিও প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য ইঙ্গিত দেয়, প্রাথমিক যুগে ইহুদিদের ধর্মচর্চা কেনানীয় বহুদেবতাবাদীদের প্রথা থেকে খুব আলাদা ছিল না (Whitelam 1996)। ইব্রাহিমি একেশ্বরবাদ ছিল এক দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফল। যা কেনানীয় বহুদেবতাবাদ থেকে ধীরে ধীরে আলাদা হয়ে স্বতন্ত্র ঐতিহ্যে পরিণত হয়। ফলে, বাইবেলের বয়ানকে আক্ষরিক অর্থে নিয়ে প্রাচীন কেনানীয় বহুদেবতাবাদকে ইব্রাহিমি একেশ্বরবাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ঐতিহ্য হিসেবে দেখাটা ঠিক নয়। বরং নিজস্ব ধর্মীয় পরিচয় গঠনের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত। ইতিহাস চর্চায় সাম্প্রদায়িক ঝোঁক এড়াতেও যা জরুরি। Masalha (2018) দাবি করেছেন, গোত্রপিতাদের যুগের ঘটনাগুলোর পক্ষে এক বাইবেলের বয়ান ছাড়া মজবুত কোন ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে ইব্রাহিমি ধার্মিকদের জন্য এসব নিতান্তই ধর্মীয় বিশ্বাস হলেও আধুনিক রাজনৈতিক জায়নবাদ এগুলো কাজে লাগিয়েছে ইসরায়েল রাষ্ট্রের পক্ষে ধর্মসম্মতি আদায়ের লক্ষ্যে। ধর্মীয় বিশ্বাসকে পরিণত করেছে রাজনৈতিক জুলুমের হাতিয়ারে। দেশে দেশে কালে কালে যেমনটা অনেকেই করে। যার পরিণাম ফিলিস্তিনিদের জন্য হয়েছে অত্যন্ত মর্মান্তিক। তবে ফিলিস্তিনি খ্রিস্টান ধর্মতাত্ত্বিক মুন্থের ইসহাক ইব্রাহিমি একেশ্বরবাদের মুক্তিবাদী বোঝাপড়ার ভেতর দিয়ে রাজনৈতিক জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন (Isaac 2025)।
৩২৬ সালে সম্রাট কনস্টান্টাইনের মা হেলেনা জেরুসালেমে তীর্থযাত্রায় যান, পরের বছর তিনি সেখানে “আবিষ্কার করেন” প্রকৃত ক্রুশ। ফলে কালক্রমে জেরুসালেম খ্রিস্টানদের তীর্থ হিসেবে ধর্মতাত্ত্বিক-রাজনৈতিক গুরুত্ব অর্জন করে। ৩৩৫ সালে জেরুসালেমে নির্মিত হয় চার্চ অফ দ্য হোলি সেপুলচার।
৬৩০ সালে জেরুসালেমের কথিত প্রকৃত ক্রুশের অংশবিশেষ পুনর্বহাল করেন রোমক সম্রাট হেরাক্লিয়াস। ৬০ বছর আগে মক্কায় আরেকজন নবি জন্মেছিলেন। যাঁর নাম মুহাম্মদ।
৬৩৬ সালে সেই নবির অনুসারীদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান রাশিদুন খেলাফত জেরুসালেম জয় করে। পরের সাড়ে চারশো বছর ফিলিস্তিন আরব শাসনে থাকে। এ সময় জেরুসালেমে নির্মিত হয় আল-আকসা মসজিদ। মুসলমানদের কাছে যার বিশেষ ধর্মতাত্ত্বিক গুরুত্ব রয়েছে। এখনো ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক আল-আকসা। ১০৭১ সালে মানজিকার্টের যুদ্ধের ধারাবাহিতায় ফিলিস্তিন সেলজুক সুলতানদের হাতে চলে যায়। অচিরেই ফিলিস্তিন নিয়ে শুরু হয় এক ধর্মযুদ্ধ (Asbridge 2010)।
মধ্যযুগীয় ফিলিস্তিন: ক্রুসেডারদের আগমন থেকে ওসমানি শাসন
“Jerusalem is the house of the one God, the capital of two peoples, the temple of three religions and she is the only city to exist twice—in heaven and on earth.”
Simon Sebag Montefiore, Jerusalem: The Biography
নভেম্বর ২৭, ১০৯৫।
প্রথম ক্রুসেডের ডাক দিলেন পোপ দ্বিতীয় আরবান। ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল, সেলজুক তুর্কিদের হাত থেকে পবিত্র ভূমি, অর্থাৎ ফিলিস্তিন, পুনরুদ্ধার করা (Asbridge 2010)। মধ্যযুগীয় ফিলিস্তিনের ইতিহাসের মূল বিষয় আরব-তুর্কি মুসলিম শাসন ও ক্রুসেডের যুগের এই সংঘাত।
উমাইয়া খলিফাদের শাসনামলে ফিলিস্তিন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও ধর্মীয় কেন্দ্রে পরিণত হয় (Masalha 2018)। উমাইয়া-আব্বাসীয় খলিফাদের শাসনামলে ফিলিস্তিন প্রশাসনিকভাবে সুবিন্যস্ত ছিল। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি ও সেনা ইউনিট স্থানীয় রীতিরেওয়াজের সাথে সঙ্গতিপূর্ণভাবে স্রেফ খাজনা আদায় করে ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখত।
ক্রুসেডারদের আগমন এই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জ করে। ফিলিস্তিনের স্থানীয় মুসলিম শাসকরা সাময়িকভাবে ক্ষমতা হারান। তবে সালাউদ্দিন আইয়ুবীর মত সাহসী ও যোগ্য নেতৃত্বের বদৌলতে বিভিন্ন সামরিক কৌশল ও জোটের মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন (Asbridge 2010; Harms and Ferry 2017)।
ফিলিস্তিনের সামাজিক জীবন মধ্যযুগে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ছিল। ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিম সম্প্রদায়ের সম্পর্ক কখনও সহযোগিতামূলক আর কখনও সংঘাতপূর্ণ ছিল। খলিফাদের শাসনামলে মাদ্রাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক শিক্ষা প্রচারকেন্দ্র হিসেবে কাজ করত। ক্রুসেডের যুগে যেমন খ্রিস্টান সম্প্রদায় ক্যাথেড্রাল, মঠ ও ধর্মীয় সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে তাঁদের ধর্মীয় পরিচয় রক্ষা করতেন (Masalha 2018; Asbridge 2010)। ধর্মীয় প্রভাব কেবল তীর্থস্থানে সীমিত ছিল না। আইন, সামাজিক আচরণ, ও দৈনন্দিন জীবনও এর দ্বারা প্রভাবিত হত। ফলে, ফিলিস্তিন একটি বহুধর্মীয় সমাজ গড়ে ওঠে।
ক্রুসেডের যুগে খালি যুদ্ধবিগ্রহই হয়েছে এমনটা নয়। ক্রুসেডারদের আগমনের ফলে পশ্চিম ইওরোপের সাথে বাণিজ্যিক, কারিগরি ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ও বৃদ্ধি পেয়েছিল। যা স্থানীয় মুসলিম ও খ্রিস্টান কারিগরদের মধ্যে সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি করে (Harms and Ferry 2017; Asbridge 2010)।
ফলে, ফিলিস্তিনে মধ্যযুগ মোটেও অন্ধকার ছিল না। বরং রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় দিক থেকে তা ছিল এক জটিল ও বহুমাত্রিক বিকাশের কাল।
ওসমানি ফিলিস্তিন: স্থানীয় বিদ্রোহ থেকে বিদেশি আগ্রাসন
“Her eyes are Palestinian;
Her name is Palestinian;
Her dreams and sorrows;
Her veil, her feet, and body;
Her words and silence are Palestinian;
Her birth ... her death.”
Mahmoud Darwish, A Lover from Palestine
১৫১৬/১৭ সালে ফিলিস্তিন ওসমানি সুলতানদের হাতে আসে। পরবর্তী চারশো বছর ফিলিস্তিনিদের শাসন করবেন তাঁরা। কিন্তু নির্বিঘ্নে নয়।
১৭০৩-০৭ সালে জেরুসালেমে ওসমানি প্রশাসনের বিরুদ্ধে সংঘটিত হয় নকিব আল-আশরাফ বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহের নেতা ছিলেন মোহাম্মদ বিন মোস্তফা আল-ওয়াফা’ই আল-হোসেইনি। তিনি ছিলেন তাঁদের নকিব (প্রধান), যাঁদের ইসলামের নবির সরাসরি বংশধর (আশরাফ) ভাবা হয় (Interactive Encyclopedia of the Palestinian Question)।
১৭৪৬-৭৫ সালে গালিলির জায়দানি বংশ ফিলিস্তিনে প্রত্যক্ষ ওসমানি শাসনকে চ্যালেঞ্জ করে বসে। তুলা, শস্য, জলপাইয়ের তেল, আর তামাক রফতানির ওপর নিজ একচেটিয়া কাজে লাগিয়ে গালিলি ও তার পশ্চাৎভূমির ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেন জহির আল-ওমর আল-জায়দানি, পৌঁছে যান নাজারেথ পর্যন্ত। আক্রেকে রাজধানী বানিয়ে স্বাধীনভাবে শাসন করতে থাকেন (Interactive Encyclopedia of the Palestinian Question)। ১৮০৪ সালে ওসমানিরা জায়দানি স্বায়ত্তশাসনের অবসান ঘটায়। ওসমানি সুলতান আহমাদ পাশা আল-জাজ্জারকে সিদন উলাইয়াতের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেন। আল-জাজ্জার আক্রেতে তার সরকার স্থাপন করেন এবং আক্রে-কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক একচেটিয়া টিকিয়ে রাখেন; তবে প্রকাশ্যে ইস্তানবুলের ওসমানি কর্তৃপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করা থেকে বিরত থাকেন। এই আল-জাজ্জারের তীব্র প্রতিরোধের মুখেই ১৭৯৯ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্তের ফিলিস্তিন দখল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায় এবং তিনি রণে ভঙ্গ দিয়ে মিসরে ফিরে যেতে বাধ্য হন (Interactive Encyclopedia of the Palestinian Question)।
১৮২৫-২৬ সালে ওসমানিদের জোরপূর্বক কর সংগ্রহের বিরুদ্ধে সংঘটিত হয় জেরুসালেম বিদ্রোহ। ফিলিস্তিনিরা জেরুসালেমের নিয়ন্ত্রণ নেন এবং শহরটি থেকে ওসমানি সেনাদের তাড়িয়ে দেন। বিদ্রোহের জন্য নেতাদের কোন সাজা দেয়া হবে না, ওসমানিরা এই ওয়াদা করার পর বিদ্রোহীদের শান্তিপূর্ণ আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বিদ্রোহের অবসান ঘটে (Interactive Encyclopedia of the Palestinian Question)।
১৮৩১-৩৪ সালে মিসরের শাসক মোহাম্মদ আলীর ছেলে ইব্রাহিম পাশার নেতৃত্বে মিসরীয় সেনাবাহিনী ফিলিস্তিনে হামলা চালায় এবং ওসমানিদের কাছ থেকে অঞ্চলটির অধিকাংশের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
১৮৩৪ সালে মিসরীয় শাসনের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনে গণঅভ্যুত্থান দেখা দেয়। নাবলুসে শুরু হওয়া এই বিদ্রোহ অচিরেই ছড়িয়ে পড়ে উত্তরের গালিলি থেকে গাজা, জেরুসালেমের পাহাড়ে, ও হেবরনে। স্থানীয়দের গণঅভ্যুত্থানের মুখে সাময়িকভাবে পিছু হটে জাফায় অবস্থান নিতে বাধ্য হন ইব্রাহিম পাশা। কিন্তু মিসর থেকে নতুন করে সেনাদল এলেই দ্রুত ফিলিস্তিনের ওপর নিয়ন্ত্রণ পুনর্বহাল করেন। গণঅভ্যুত্থানের নেতাদের মৃত্যদণ্ড কার্যকর করা হয়। উলামা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নির্বাসিত করা হয়। হেবরন আর আল-কারাক বিশেষভাবেই লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছিল।
এইসব স্থানীয় বিদ্রোহ ও বিদেশি আগ্রাসনে ওসমানিরা যখন দিশেহারা, ফিলিস্তিনের দিকে চুপচাপ ধেয়ে আসছিল এক নতুন বিপদ।
অশনি সংকেত: ইওরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ থেকে জায়নবাদী বসতিস্থাপন
“The bride is beautiful, but she is married to another man.”
Two Rabbis from Vienna commenting on Palestine, 1896/97
১৮৩৯-৬২ সালে অনেকগুলো ইওরোপীয় দেশ জেরুসালেমে কনস্যুলেট খোলে। এঁদের মধ্যে ছিল গ্রেট ব্রিটেন (১৮৩৯), প্রুশিয়া, ফ্রান্স, ও সার্ডিনিয়া (১৮৪৩), অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্য (১৮৪৯), স্পেন (১৮৫৪), রাশিয়া (১৮৫৮) ও গ্রিস (১৯৬২)। যুক্তরাষ্ট্র জেরুসালেমে কনস্যুলেট খোলে ১৮৫৬ সালে (Interactive Encyclopedia of the Palestinian Question)।
পবিত্র ভূমিতে বসবাসরত খ্রিস্টানদের রক্ষা করার দোহাই দিয়ে এই পদক্ষেপ নেয়া হলেও আসল উদ্দেশ্য ছিল ক্রমেই দুর্বল হয়ে আসতে থাকা ওসমানি সুলতানশাহির ওপর নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধি করা (রাফিন ২০২৩)।
১৮৫৮ সালের ২১ এপ্রিল ওসমানি সুলতানশাহির সর্বত্র জারি করা হয় ওসমানি ভূমি বিধি। বিপুল সংখ্যক ভূমি ব্যক্তিগত মালিকানায় রাখার অনুমতি দেয়া এই আইন ফিলিস্তিনে দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ফেলে। এর ধারাবাহিকতায় ১৮৬৭ সালের ১০ জুন ওসমানি সুলতানশাহিতে বিদেশিদের বৈধভাবে জমি কেনার অধিকার দেয়া আইন পাশ হয়। এর আগ পর্যন্ত এই অধিকার স্রেফ মুসলমান ও ওসমানি প্রজাদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। এর ফলে ওসমানি ফিলিস্তিনের ভূমি বাজার ইহুদি-অইহুদি নির্বিশেষে ইওরোপীয়দের জন্য উন্মুক্ত হয়ে গেল। এই আইনী পরিবর্তন পরবর্তীতে উপনিবেশায়নের কাজে এসেছে। “বৈধ” দখলদারিত্বের স্বার্থে এসব ব্যবহার করা হয়েছে।
১৮৭৮ সালের ওসমানি ফিলিস্তিনের দলিলপত্র থেকে দেখতে পাই, এ সময় জেরুসালেম, নাবলুস আর আক্রে শহরে বসবাসরত চার লক্ষাধিক মানুষের মধ্যে মাত্র ১৫,০০০ ইহুদি। বিদেশি নাগরিক হিসেবে আরো ১০,০০০ ইহুদি আছেন। এসময় স্পষ্টত আরবরাই ফিলিস্তিনের জনমিতিক সংখ্যাগুরু (Beinin and Hajjar 2025)।
কিন্তু এই বাস্তবতা দ্রুত বদলাতে শুরু করবে।
১৮৭৮-৮২ সালে জেরুসালেমের ইহুদিরা জাফার নিকটবর্তী ফিলিস্তিনি গ্রাম মুলাব্বাসে প্রতিষ্ঠা করেন পেতাহ তিকভা (আশার দরজা)। এঁরা স্থানীয় ইহুদি। ক্ষুধা আর ম্যালেরিয়ার ধকল সইতে না পারায় দ্রুত বসতিটি ছেড়ে যান তাঁরা।
১৮৮২-১৯০৩ সালে সম্পন্ন হয় প্রথম আলিয়া, মূলত রাশিয়া থেকে ২৫ হাজার ইহুদির আগমন। ধনী ইওরোপীয় ইহুদিদের ব্যাপক অর্থনৈতিক সহায়তার ফলে বসতিস্থাপনকারীরা কৃষিকেন্দ্রিক বানিজ্যোদ্যোগ নিতে সমর্থ হন। ব্যারন এডমন্ড দে রথসচাইল্ড আর ব্যারন মরিস দে হির্শ এরকম দুজন উল্লেখযোগ্য মদতদাতা।
১৮৮২ সালে এই প্রথম আলিয়ায় ফিলিস্তিনে আসা ইহুদিদের হাত ধরে পেতাহ তিকভায় (আশার দরজা) প্রতিষ্ঠিত হয় দেশটির প্রথম জায়নবাদী বসতি। জেরুসালেম জেলায় প্রতিষ্ঠিত হল আরো দুটি বসতি: রিশন লেজায়ন এবং নেস ৎসিয়না। আর দুটি বসতি প্রতিষ্ঠিত হল নাবলুস জেলায়: জিখরন ইয়া’কভ ও রশ পিনা (রাফিন ২০২৩)।
১৮৮৩ সালে নাবলুস জেলায় প্রতিষ্ঠিত হয় ইয়েসুদ মা’আলা বসতি। ১৮৮৪ সালে জেরুসালেম জেলায় প্রতিষ্ঠিত হয় একরন আর গাদেরা বসতি, ১৮৯০ সালে রেহোবত বসতি, ১৮৯৪ সালে মোতসা বসতি, ১৮৯৫ সালে হার্তুব বসতি, ১৮৯৬ সালে বীর তুব্যা বসতি, ১৯০৭ সালে বেন শেমেন বসতি। ১৮৯০ সালে আক্রে জেলায় প্রতিষ্ঠিত হয় মিশমার হাইয়ারদিন বসতি, ১৮৯১ সালে হাদেরা, শেফেইয়া, ও এইন জেইতিম বসতি, ১৮৯৬ সালে মেতুলা বসতি, ১৮৯৯ সালে সেজেরা ও মাহানায়িম বসতি, ১৯০২ সালে মাস-হা ও ইয়েভনিয়েল বসতি, ১৯০৪ সালে বেইত গান বসতি (রাফিন ২০২৩)।
কিন্তু এই প্রাক-ম্যান্ডেট যুগের জায়নবাদী বসতিস্থাপন যে বিনা প্রতিরোধে ঘটতে পেরেছিল তা নয়।
১৮৮৬ সালের ২৯ মার্চ ভূমি মালিকানা নিয়ে আল-ইয়াহুদিয়া গ্রামের ফিলিস্তিনি আরবদের সাথে পেতাহ তিকভা বসতির ইহুদি বসতিস্থাপনকারীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। স্থানীয়দের আক্রমণে এক ইহুদি বসতিস্থাপনকারী খুন হন। ওসমানি সেনারা ৩০ জন ফিলিস্তিনিকে গ্রেফতার করে। তাঁদের জাফায় নিয়ে আসা হয়। সেখানকার ইওরোপীয় কনস্যুলেটগুলো, যারা মূলত ইহুদি বসতিস্থাপনকারীদের প্রতিনিধিত্ব করতেন, গ্রেফতারকৃত আরবদের সাজা দিতে হবে এই দাবি তোলেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য কারো বিচার করা হয়নি। আদালতের বাইরে দুপক্ষের মধ্যে একটা আপোসরফা হয়েছিল (Interactive Encyclopedia of the Palestinian Question)।
১৯০৪ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে টাইবেরিয়াস অঞ্চলে আল-শাজারা গ্রামের ফিলিস্তিনি চাষীদের সাথে সেজেরা উপনিবেশের বসতিস্থাপনকারীদের দ্বন্দ্ব দেখা দিলে এক বসতিস্থাপনকারী নিহত হন।
তবে প্রতিরোধের সশস্ত্র প্রচেষ্টার পাশাপাশি আইনী প্রচেষ্টাও ছিল।
১৮৯১ সালের ২৪ জুন জেরুসালেমের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ফিলিস্তিনে রুশ ইহুদিদের বসতিস্থাপন ও জমি কেনার ওপর নিষেধাজ্ঞা চেয়ে ইস্তানবুলে একটা পিটিশন করেন।
১৮৮৮ থেকে ১৮৯৩ সালের মধ্যে ওসমানিরা একাধিকবার নিজেরাও চেষ্টা করেছিল আইনী উপায়ে এই প্রক্রিয়ার লাগাম টেনে ধরতে (Interactive Encyclopedia of the Palestinian Question)। কিন্তু তখন সাম্রাজ্যটি দুর্বলতার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছে। তাই তাঁদের এই মরিয়া প্রয়াসগুলো সফল হয়নি।
১৮৯১ সালের সেপ্টেম্বরে জার্মান ব্যারন মরিস দে হির্শ কর্তৃক লন্ডনে প্রতিষ্ঠিত হল জিউইশ কলোনাইজেশন অ্যাসোসিয়েশন (জেসিএ)। ১৮৯৬ সাল থেকে জেসিএ ফিলিস্তিনে ইহুদি কৃষি বসতিস্থাপনে মদত দিতে শুরু করে। এ বছরই জায়নবাদ পায় তার শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীকে।
১৮৯৬ সালে অস্ট্রীয় সাংবাদিক থিওডর হার্জেল Der Judenstaat নামে একটি বই প্রকাশ করেন। তাতে তিনি “ইহুদি প্রশ্নের” সমাধান হিসেবে ফিলিস্তিন বা অন্য কোথাও একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার পক্ষে ওকালতি করেন। এই বইটি ভবিষ্যৎ ইসরায়েল রাষ্ট্রের তাত্ত্বিক ভিত্তি।
১৮৯৭ সালের ২৯-৩১ আগস্টে সুইজারল্যান্ডের বাসেলে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম বিশ্ব জায়নবাদী কংগ্রেস। প্রতিষ্ঠা করা হয় বিশ্ব জায়নবাদী সংগঠন। এর প্রেসিডেন্ট হন অস্ট্রীয় সাংবাদিক থিওডর হার্জেল। ১৮৯৯ সালের ১৫-১৮ আগস্টে বাসেলে অনুষ্ঠিত হওয়া তৃতীয় বিশ্ব জায়নবাদী কংগ্রেসে ফিলিস্তিনে ইহুদি উপনিবেশায়নে আর্থিক মদত যোগানোর উদ্দেশ্যে একটি ইহুদি উপনিবেশিক ট্রাস্ট গঠন অণুসমর্থন করা হল। সেইসাথে ঠিক করা হল যে, এই ট্রাস্টের তহবিল শুধুমাত্র সিরিয়া ও ফিলিস্তিনে ব্যয় করা হবে। ১৯০০ সালের ১৩-১৬ আগস্ট লন্ডনে অনুষ্ঠিত হওয়া চতুর্থ বিশ্ব জায়নবাদী কংগ্রেসে একটি ইহুদি জাতীয় তহবিল গঠন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হল। ফিলিস্তিনে জমি ক্রয় ও “উন্নয়নের” একটি সংগঠন হিসেবে (Interactive Encyclopedia of the Palestinian Question)।
১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হল জিউইশ ন্যাশনাল ফান্ড (জেএনএফ)। ১৯০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ফিলিস্তিন অফিস, যা ১৯২৯ সালে জিউইশ এজেন্সিতে রূপান্তরিত হবে। ১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এন্টাই-ডিফেমেশন লীগ (এডিএল)।
১৯০৪-১৪ সালে সম্পন্ন হয় দ্বিতীয় আলিয়া, মূলত রাশিয়া থেকে ৪০ হাজার ইহুদির আগমন। ১৯১৪ সালে শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। তার আগেই ফিলিস্তিনি ইওরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের মদতে জায়নবাদী বসতিস্থাপনের মূল কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়।
তবে তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জায়নবাদী বসতিস্থাপক-উপনিবেশটি প্রতিষ্ঠা করার সময় আসেনি, তার জন্য আরো সাড়ে তিন দশক লাগবে।
ম্যান্ডেটরি ফিলিস্তিন: সাইকস-পিকো চুক্তি থেকে পার্টিশন পরিকল্পনা
“We are a nation threatened by disappearance.”
‘Isa and Yusuf al-‘Isa, Filastin, May 7, 1914
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯১৬ সালের সাইকস-পিকো গোপন চুক্তি পশ্চিম এশিয়ার ভাগ্য নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা রেখেছিল। এই চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটিশ ও ফরাসিরা ওসমানি সুলতানশাহির আরব অঞ্চলগুলোকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল ফিলিস্তিনকে একটি আন্তর্জাতিক প্রশাসনিক অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত করা (Pappé 2024); কিন্তু যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতি ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করে।
১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ইস্যু করা হয় ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড আর্থার বেলফোরের বেলফোর ঘোষণা; যাতে বলা হয়, ফিলিস্তিনে “ইহুদিদের একটি জাতীয় নিবাসভূমি” স্থাপনে সহায়তা দেবে গ্রেট ব্রিটেন। ১১ ডিসেম্বর জেরুসালেমের ওল্ড সিটিতে ঢোকেন জেনারেল এডমুন্ড অ্যালেনবি; তিন বছরের জন্য ফিলিস্তিন ব্রিটিশ দখলদারিত্বে ও সামরিক প্রশাসনের অধীনে চলে যায়। ১৯২০ সালে সান রেমো সম্মেলনে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট গৃহীত হয়, ১৯২২ সালে লীগ অফ নেশনসে অনুসমর্থন লাভ করে (রাফিন ২০২৩)।
১৯১৯-২৩ সালে সম্পন্ন হয় তৃতীয় আলিয়া, মূলত রাশিয়া থেকে ৪০ হাজার ইহুদির আগমন। ১৯২৪-২৮ সালে সম্পন্ন হয় চতুর্থ আলিয়া, মূলত পোল্যান্ড থেকে ৮০ হাজার ইহুদির আগমন (রাফিন ২০২৩)। ফিলিস্তিনে এভাবে ইওরোপীয় ইহুদিদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৯২০ সালে গঠিত হয় জায়নবাদী প্যারামিলিটারি সংগঠন হাগান্না, ১৯৩১ সালে যার একাংশ বেরিয়ে এসে গঠন করে নতুন প্যারামিলিটারি সংগঠন ইরগুন। ১৯২৯ সালের আরব-ইহুদি দাঙ্গায় বহু হতাহত হন। এসব সঙ্গত কারণেই ফিলিস্তিনিদের বিচলিত করে তুলছিল। অচিরেই এই অনুভূতি তীব্র বিদ্রোহে রূপ নেয়, যা চরিত্রের দিক থেকে ছিল উপনিবেশবাদবিরোধী (Pappé 2016; Khalidi 2020)।
১৯৩০-৩৫ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশিক ও ইহুদি বসতিস্থাপকদের বিরুদ্ধে শেখ ইজ্জাদদিন আল-কাশেমের নেতৃত্বে ফিলিস্তিনিদের লড়াই শুরু হয়। ১৯৩৬-৩৯ সালে জাফায় দেখা দেয় ফিলিস্তিনি বিদ্রোহ, যা ব্রিটিশরা জায়নবাদী মিলিশিয়া ও আরব বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর সহায়তায় দমন করে। এই বিদ্রোহে ৫,০০০এরও বেশি ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়, আর আহত হন ১৫,০০০এরও বেশি ফিলিস্তিনি (রাফিন ২০২৩)।
এই বিদ্রোহগুলো ব্রিটিশদের নীতি সংশোধনে বাধ্য করে। ১৯৩৭ সালে পিল কমিশনের দাখিলকৃত প্রতিবেদনে প্রথমবারের মত ফিলিস্তিনকে আরব আর ইহুদি অংশে পার্টিশনড করার সুপারিশ করা হয়। ১৯৩৯ সালের ১৭ মে প্রকাশিত হয় ব্রিটিশ সরকারের শ্বেতপত্র, যাতে ফিলিস্তিনে ইহুদি বসতিস্থাপকদের আগমন সীমিত করা হয়।
১৯৩৯-৪৫ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ব্রিটিশদের দুর্বল করে ফেলেছিল, ফিলিস্তিন ধরে রাখা তাঁদের পক্ষে আর সম্ভব ছিল না। তাই ১৯৪৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশরা ফিলিস্তিন ইস্যু নবগঠিত জাতিসংঘের হাতে তুলে দেয়। ২৯ নভেম্বর জাতিসংঘ তার পার্টিশন পরিকল্পনা [প্রস্তাব নং ১৮১(২)] পেশ করে। ফিলিস্তিনের বুকে একটি আরব রাষ্ট্র ও একটি ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের এবং জেরুসালেম আর তার আশেপাশের এলাকার ওপর আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ কায়েমের প্রস্তাব দেয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ইহুদি বসতিস্থাপনকদের প্রতিনিধিরা জাতিসংঘের পার্টিশন পরিকল্পনা সমর্থন করলেও ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিরা প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ এই পরিকল্পনায় ইহুদিদের জন্য বরাদ্দ দেয়া ভূমির পরিমাণ ছিল ফিলিস্তিনে তাঁদের তৎকালীন জনসংখ্যার তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি (Pappé 2024)। Khalidi (2020)র মতে, এই পরিকল্পনা বাস্তবে একটি উপনিবেশিক প্রকল্পকে ধর্মসম্মতি দিয়েছিল এবং ফিলিস্তিনিদের তাঁদের ভূমি থেকে বঞ্চিত করেছিল।
কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালেই ইওরোপীয় ইহুদিরা এক পদ্ধতিগত নিধনযজ্ঞের শিকার হন, যা প্রতিষ্ঠার পর থেকে জায়নবাদী বসতিস্থাপক-উপনিবেশটির পক্ষে সম্মতি উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
হলোকাস্ট ইন্ডাস্ট্রি: জেনোসাইডের স্মৃতি ও জায়নবাদের রাজনীতি
“The sufferings of European Jewry, from the pogroms in Tsarist Russia to the slaughterhouses of Auschwitz and Treblinka, were the responsibility of bourgeois civilisation. The Palestinian Arabs were being made to pay for these crimes, while the West was arming Israel and paying it ‘conscience money’.”
Tariq Ali
“You cannot continue to victimize someone else just because you yourself were a victim once—there has to be a limit.”
Edward Said
হলোকাস্ট মানবেতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ জেনোসাইড হিসেবে স্বীকৃত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান নাৎসিরা ৬০ লক্ষ ইওরোপীয় ইহুদিকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করে। যা ইহুদিদের প্রতি বৈশ্বিক সহমর্মিতা তৈরি করেছে। কিন্তু যুদ্ধোত্তর দুনিয়ায় এই জেনোসাইডের স্মৃতিকে কেবল শোক ও শিক্ষায় সীমিত রাখা হয়নি। ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা ও তাকে বৈধতা প্রদানের একটি নৈতিক হাতিয়ার রূপে ব্যবহৃত হয়েছে হলোকাস্ট। নরম্যান ফিঙ্কেলস্টেইন এর নাম দিয়েছেন হলোকাস্ট ইন্ডাস্ট্রি। তাঁর মতে, এই ইন্ডাস্ট্রি যুদ্ধোত্তর দুনিয়ায় বৈশ্বিকভাবে পশ্চিমা স্বার্থের পক্ষে একটি বিশেষ সুবিধাভোগী বয়ান তৈরি করেছে, পশ্চিম এশিয়ায় যা মূলত জায়নবাদী স্বার্থকে এগিয়ে নেয় (Finkelstein 2024)।
হলোকাস্টের স্মৃতি এভাবে একটি ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত হয়েছে; যেখানে সার্ভাইভারদের সত্যিকারের যন্ত্রণা ও দুঃখের স্মৃতিকে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির পক্ষে কাজে লাগানো হয়। Finkelstein (2024) দেখান, কীভাবে ইহুদি সার্ভাইভারদের উপকার করার চেয়ে পশ্চিমা ব্লকভুক্ত রাষ্ট্রসমূহ ও ইসরায়েল এই ট্র্যাজেডিকে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা আদায়েই বেশি ব্যবহার করেছে। এভাবে হলোকাস্টের ইতিহাস একটা “পবিত্র” চরিত্র অর্জন করেছে, যেখানে যে কোন সমালোচনা বা বিকল্প বয়ান তুলে ধরা অসম্ভব হয়ে উঠেছে (Finkelstein 2024)।
গিলবার্ট আচকার পুরো ব্যাপারটাকে একটু ভিন্নভাবে দেখেছেন। তাঁর মতে, যুদ্ধোত্তর আরব বিশ্বে হলোকাস্টের স্মৃতিচর্চা এক অদ্ভুত দ্বৈত সঙ্কট তৈরি করেছে। একদিকে, বহু আরবের কাছেই ইওরোপীয় ইহুদিদের ওপর হওয়া নাৎসি গণহত্যা স্বীকৃত ও নিন্দনীয়। অন্যদিকে, এই ইতিহাসকে ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় বৈধতা ও ফিলিস্তিনিদের জমি দখলের নৈতিক অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যা আরবদের কাছে সঙ্গত কারণেই গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে, হলোকাস্টের অর্থ সকলের কাছে সমান নয়। প্রেক্ষিতের ভিন্নতার কারণে মানেও আলাদা হয়ে গেছে। আচকারের মতে, বয়ানের এই দ্বৈততা আরব-ইসরায়েল সংঘাতের স্মৃতির রাজনীতিকে অত্যন্ত জটিল করে তোলে (Achcar 2024)।
ফিলিস্তিনিদের ব্যাপারে ইসরায়েলি নীতি যত নিষ্ঠুরই হোক, তার যৌক্তিক সমালোচনাকেও “এন্টাইসেমিটিক” তকমা দিয়ে খারিজ করে দেয়া হয়। Finkelstein (2024)য়ের দাবি, এই কৌশল সমালোচনার পরিসর সীমিত করে এবং ইসরায়েলের দমন নীতির পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় করে। এভাবে অতীতের ভিকটিমদের স্মৃতিচারণ নিজেই নতুন ভিকটিম তৈরির এক স্ববিরোধী প্রক্রিয়ায় রূপ নিয়েছে।
(Achcar 2024)য়ের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে আরবদের বয়ান। তাঁর মতে, যে জেনোসাইডের দায় ইওরোপীয়দের, তাঁর ক্ষতিপূরণের ভার ফিলিস্তিনিদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া এক ধরণের ঐতিহাসিক অন্যায়। এর ফলে, হলোকাস্টের স্মৃতি সময়ের সাথে তার মানবিক তাৎপর্য হারিয়ে ফেলে ফিলিস্তিনে এসে হয়ে গেছে জুলুমের হাতিয়ার।
স্মৃতি জরুরি জিনিশ। মানুষের ইতিহাস চর্চায় যা এক অনিবার্য উপাদান। কিন্তু এমনকি জেনোসাইডের স্মৃতিরও রাজনৈতিক অপব্যবহার সম্ভব।
স্মৃতিচর্চার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মজলুম মানবতার মুক্তি, কোন রাষ্ট্রীয় বয়ান বা কৌশলের পক্ষে সম্মতি উৎপাদন করা না।
নাকবা: ইসরায়েলের “স্বাধীনতা“, ফিলিস্তিনের বিপর্যয় (১৯৪৮)
“I have learned and dismantled all the words in order to draw from them a
single word: Home.”Mahmoud Darwish, I Belong There
মে ১৪, ১৯৪৮।
ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের ওপর ঘোষিত হল ইসরায়েল রাষ্ট্র। ইসরায়েলের প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন শাইম ওয়াইজম্যান, প্রথম প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলেন ডেভিড বেন-গুয়িরন। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়।
ইসরায়েলে দিনটি উদযাপিত হয় স্বাধীনতা দিবস হিসেবে, ইবরানি ভাষায় বললে ইয়োম হা’আজমাউত (יוֹם הָעַצְמָאוּת)।। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের জন্য এটা ছিল একটা বিপর্যয়, আরবি ভাষায় যা দিকরা আন-নাকবা (ذكرى النكبة), বা নাকবার স্মৃতি নামে পরিচিত। প্রতি বছর ১৫ মে দিনটিতে ফিলিস্তিনিরা সেই স্মৃতিতে রাখতে নাকবা দিবস পালন করেন।
ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষিত হওয়ার সাথে সাথেই হাগান্না, ইরগুন আর স্টার্ন গ্যাংয়ের মত ইহুদি প্যারামিলিটারি সংগঠনগুলো ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভিযানে নামে। ফিলিস্তিনি গ্রামগুলো পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়, ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করা হয় এবং প্রায় ৭০০,০০০ ফিলিস্তিনি শরণার্থীতে পরিণত হন (Morris 2004; Pappé 2006)। Pappé (2006) একে “জাতিগত শুদ্ধি অভিযান” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, কারণ এই অভিযানের পেছনে একটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল: ফিলিস্তিনকে ইহুদি-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করা।
বিভিন্ন নথি ও মৌখিক সাক্ষ্য থেকে জানা যায়, এ সময় শত শত গ্রাম সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা হয়েছিল। যা সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিকে মারাত্মকভাবে জখম করে। ফিলিস্তিনিদের শরণার্থী হওয়া কোন সাময়িক ব্যাপার ছিল না; তা এক দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় পরিণত হয়।
প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর শরণার্থী শিবিরগুলোতে ফিলিস্তিনের মূলত কৃষিজীবী সমাজের সন্তানদের মধ্যে ধীরে ধীরে বিপ্লবী রাজনৈতিক চেতনা গড়ে ওঠে (Sayigh 1979)।
জায়নবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা ইসরায়েলের দরবারি ইতিহাসে ১৯৪৮ সালের ঘটনাটি ছিল “স্বাধীনতা যুদ্ধ।” কিন্তু ফিলিস্তিনিদের কাছে এটা ছিল এক বিপর্যয়। একটা ঐতিহাসিক ট্রমা। Khalidi (2020)র মতে, নাকবা ১৯৪৮ সালে শেষ হয়নি। বরং এটা ছিল একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার শুরুয়াত। যার উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনিদের স্রেফ মুছে ফেলা। চলমান গাজা জেনোসাইড সেই অর্থে নাকবারই ধারাবাহিকতা।
চারটি আরব–ইসরায়েল যুদ্ধ (১৯৪৮-৭৩)
“Our enemies did not cross the border
They crept through our weakness like ants.”Nizar Qabbani, Marginal Notes on the Book of Defeat
নাকবার পরপরই শুরু হয় প্রথম আরব–ইসরায়েল যুদ্ধ (১৯৪৮–৪৯)। মিশর, জর্দান, সিরিয়া, ইরাক ও লেবানন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এক যোগে যুদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু পশ্চিমা মদত ও উন্নততর সামরিক কৌশলের কারণে ইসরায়েলিরা এই যুদ্ধে সহজেই জয়লাভ করে (Morris 2008; Shlaim 1988)।
১৯৪৯ সালের অস্ত্রবিরতি চুক্তির পর, জাতিসংঘের পার্টিশন পরিকল্পনায় ইহুদিদের যেটুকু ভূমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল, ইসরায়েল তারচে বেশি ভূমি দখল করে নেয়। ফিলিস্তিনিদের জন্য বরাদ্দ ভূমির পরিমাণ কমে আসে। প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলো ছিল বিভাজিত ও দুর্বল।
১৯৫৬ সালে সংঘটিত হয় দ্বিতীয় আরব–ইসরায়েল যুদ্ধ, যা সুয়েজ খাল সংকট নামেও পরিচিত। মিসরের আরব জাতীয়তাবাদী প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করেন। এর অজুহাতে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সাথে মিলে মিসর আক্রমণ করে ইসরায়েল। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন মিসরের পক্ষে দাঁড়ায়। ৭ নভেম্বর ব্রিটিশ, ফরাসি, ও ইসরায়েলিরা মিসরের ওপর হামলা বন্ধ না করলে বলপ্রয়োগ করার হুমকি দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাফিন ২০২৩)। যুদ্ধোত্তর দুনিয়ার দুই পরাশক্তির এই নাটকীয় অবস্থান গ্রহণের কারণে পিছু হঠতে বাধ্য হয় ইসরায়েল। তবে যুদ্ধের সময় সাময়িকভাবে সিনাই উপত্যকা দখল করে নেয়ার ঘটনা থেকে বসতিস্থাপক-উপনিবেশটির সম্প্রসারণবাদী আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পায়।
১৯৬৭ সালের তৃতীয় আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ, যা জুন যুদ্ধ বা ৬ দিনের যুদ্ধ নামেও পরিচিত, ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকটের ইতিহাসের একটা গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এই যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় ইসরায়েল জর্দান নদীর পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুসালেম, গাজা উপত্যকা, মিসরের কাছ থেকে সিনাই উপদ্বীপ, ও সিরিয়ার কাছ থেকে গোলান মালভূমি দখল করে নেয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও রুমানিয়া ছাড়া সোভিয়েত ব্লকে থাকা অন্য ইওরোপীয় রাষ্ট্রগুলো ইসরায়েলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে (রাফিন ২০২৩)।
যুদ্ধের এই ফলাফল পশ্চিমাদের মধ্যে, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রে, ইসরায়েলের প্রতি ব্যাপক সমীহ তৈরি করে। মূলত এ সময় থেকেই ইসরায়েল পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের স্নায়ুযুদ্ধকালীন ভূরাজনৈতিক স্বার্থের লাঠিয়ালের ভূমিকা পালন করতে শুরু করে। অঞ্চলটিতে নিজ স্বার্থ রক্ষার জন্য ইসরায়েলকে অর্থনৈতিক ও সামরিক সাহায্য দিতে শুরু করে (Finkelstein 2024)।
১৯৭৩ সালের চতুর্থ আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ, যা অক্টোবর যুদ্ধ বা ইয়োম কিপুর যুদ্ধ বা রমজান যুদ্ধ নামেও পরিচিত, ছিল আরবদের সামরিক মর্যাদা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা। এই যুদ্ধে ইসরায়েলের অপরাজেয় ভাবমূর্তি ধাক্কা খায়। Chomsky (1999)র মতে, এ সময় থেকে ইসরায়েল হয়ে ওঠে “যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ”।
কিন্তু, ইসরায়েল যখন প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে যুদ্ধ করছিল, ফিলিস্তিনে তখন এক নতুন শক্তি ধীর উত্থান ঘটছিল।
পিএলও থেকে অসলো (১৯৬৪-৯৩)
“That is [a] kind of a conversation between the sword and the neck.”
Ghassan Kanafani
মে ২৮, ১৯৬৪।
গঠিত হল প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও)। একই সময় জেরুসালেমে প্যালেস্টাইনিয়ান ন্যাশনাল কাউন্সিলের (পিএনসি) প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্যালেস্টাইন ন্যাশনাল কোভেনেন্ট ইসরায়েল নামের বসতিস্থাপক-উপনিবেশটিকে ধবংস করার ডাক দেয় (রাফিন ২০২৩)।
পিএলও প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিদের জাতীয় মুক্তি আন্দোলন এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে। পিএলওর মধ্যে ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে প্রধান শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ফাতাহ, যা সশস্ত্র সংগ্রামকে জাতীয় মুক্তির মূল কৌশল হিসেবে গ্রহণ করে (Said 1992)। কিন্তু শুরু থেকেই প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলোর ছত্রছায়ায় থাকা ছিল সংগঠনটির একটা মারাত্মক দুর্বলতা।
১৯৭০য়ের দশকে পিএলও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে শুরু করে। ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তৃতা দেন আরাফাত এবং পিএলওকে ফিলিস্তিনিদের বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তবে এ সময় পশ্চিমা দেশগুলোর কূটনৈতিক চাপ ও আরব রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক আপোসকামিতা চাপ পিএলওর রাজনীতির বৈপ্লবিক হয়ে ওঠার পক্ষে একটা বাধা হয়ে দাঁড়ায় (Rodinson 1988)।
আরব আপোসকামিতার একটা নজির হল ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর। ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জর্দান সেনাবাহিনীর সাথে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধযোদ্ধাদের বাহিনীর যুদ্ধ হয়, যা জর্দানের গৃহযুদ্ধ নামে পরিচিত। ১৯৮০র দশকে লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসনের ফলে পিএলও তার কেন্দ্র লেবানন থেকে তিউনিসিয়ায় সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
এভাবে ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ আন্দোলন স্থানীয় বাস্তবতা থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রবাসী নেতৃত্বের ওপর বিপজ্জনকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে (Beinin and Hajjar 2025)। আবার, মিসর ১৯৭৯ সালে ও জর্দান ১৯৯৪ সালে ইসরায়েলের সাথে শান্তি চুক্তি করে। আরব বিশ্বে পিএলওর অবস্থান দুর্বল হয়ে আসে, যা তাকে আপোস করতে বাধ্য করে।
১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তি এই আপোসেরই পরিণাম। কাগজেকলমে এটি ছিল এক স্থায়ী শান্তি চুক্তি, যা কালক্রমে ইসরায়েলের পাশাপাশি একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন করবে। বাস্তবে এটি ইসরায়েলের দখলদারিত্বকে “বৈধ” চেহারা দেয় (Khalidi 2020; Pappé 2024)।
ফিলিস্তিনের আকাশে লাল তারা: পিএফএলপি ও ডিএফএলপি
“We are at once internationalists and patriots, and our slogan is, “Fight to defend the motherland against the aggressors.””
Mao Zedong
“দুনিয়ার মজদুর এক হও!”
বামপন্থীদের এই স্লোগানটির সাথে আমরা কমবেশি পরিচিত।
কিন্তু দুনিয়ার বহু পরাধীন ভূখণ্ডের মানুষের মত ফিলিস্তিনি বামপন্থীদের জন্যও দুনিয়ার মজদুরকে এক করার চেয়ে আশু কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে ফিলিস্তিনিদের জন্য ন্যূনতম অর্থে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা অর্জন করা।
১৯৬৭ সালের নভেম্বরে এই উদ্দেশ্যে জর্জ হাবাশ কর্তৃক গঠিত হয় পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অফ প্যালেস্টাইন (পিএফএলপি)। একই উদ্দেশ্যে পরের বছর নায়েফ হাওয়াতমেহ কর্তৃক গঠিত হয় ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অফ প্যালেস্টাইন (ডিএফএলপি)। ফিলিস্তিনের মুক্তির জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের পাশাপাশি যারা বৈশ্বিক প্রেক্ষিতে সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ প্রচার করে (Leopardi 2020)।
পিএলএফপি বিমান ছিনতাই ও আন্তর্জাতিকভাবে আলোড়ন সৃষ্টিকারী সব অভিযান চালিয়ে ফিলিস্তিন প্রশ্নকে একটি আন্তর্জাতিক প্রশ্ন করে তোলে। এতে বিশেষভাবেই উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন লায়লা খালেদ। Irving (2012) তাঁকে ফিলিস্তিনের মুক্তির প্রতীক বলেছেন।
এই দলগুলো একইসাথে আন্তর্জাতিকতাবাদের নীতি অনুসারে আরব বিশ্বের অন্যান্য বামপন্থী ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের সাথে ভ্রাতৃপ্রতিম সংহতি গড়ে তোলে (Jacobin 2025)। কিন্তু ১৯৮০র দশক থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, আরব বামপন্থার দুর্বলতা এবং পিএলওর আপোসকামিতার প্রভাবে বামপন্থী সংগঠনগুলো ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয়ে পড়ে (Leopardi 2020)। ফিলিস্তিনের আকাশের লাল তারা নিষ্প্রভ হয়ে আসে।
তবু এখনো তারা টিমটিম করে চলছে এবং ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ আন্দোলনের অংশ হয়ে আছে।
সাবরা ও শাতিলা হত্যাযজ্ঞ (১৯৮২)
“Jews, his kinsmen, the sons and grandsons of his contemporaries, former inmates of the camps, stood in tank turrets and drove, flags waving, through undefended settlements, through human flesh, ripping it apart with machine-gun bullets, rounding up the survivors in camps fenced off with barbed wire.”
Aleksandar Tišma, Kapo
সেপ্টেম্বর ১৬, ১৯৮২।
লেবাননের রাজধানী বৈরুতের সাবরা ও শাতিলা উদ্বাস্তু শিবিরের ফিলিস্তিনিদের নির্মমভাবে হত্যা করে ইসরায়েলের মদতপুষ্ট ফ্যালাঞ্জিস্ট মিলিশিয়াদের বাহিনী (রাফিন ২০২৩)। ইসরায়েলি সেনারা আগে থেকেই বৈরুত ঘেরাও করে রেখে তাদের মিত্রদের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে শিবিরে প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছিল। ৩ দিন ধরে চলে এই নৃশংস হত্যাযজ্ঞ, যাতে কয়েক হাজার ফিলিস্তিনি খুন হন (al-Hout 2004)।
এই নিষ্ঠুরতা ব্যাপক আন্তর্জাতিক নিন্দাবাদ তৈরি করলে তদন্তের জন্য ইসরায়েলে একটি কমিশন গঠিত হয়। কমিশন তদন্ত দেশে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যারিয়েল শ্যারনকে হত্যাকাণ্ডের জন্য পরোক্ষভাবে দোষী সাব্যস্ত করে। তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার সুপারিশ দেয়।
কিন্তু এর দায় কি শুধুই শ্যারনের ছিল?
সাবরা ও শাতিলা হত্যাযজ্ঞ ছিল পরিকল্পিত। ইসরায়েলি সেনারা এই হত্যাযজ্ঞ রীতিমত তদারকি করে (al-Hout 2004)। ইসরায়েলের দায় অনেক বেশি।
এই হত্যাযজ্ঞের গভীরভাবে প্রতীকী একটি অর্থ আছে। ফিলিস্তিনিদের জন্য পৃথিবীতে কোন নিরাপদ ভূমি নেই। সর্বত্রই তাঁরা বিপন্ন।
সাবরা ও শাতিলা হত্যাযজ্ঞ আন্তর্জাতিকভাবে ফিলিস্তিন প্রশ্নকে নতুন করে সামনে আনে এবং ইসরায়েলি নীতির প্রতি জনক্ষোভ বাড়ায় (Chomsky, Achcar, and Shalom 2007)।
প্রথম ইন্তিফাদা (১৯৮৭-১৯৯৩)
“Don’t listen to us
We are the people of cold calculations
Of addition, of subtraction
Wage your wars and leave us alone …
The age of political reason
Has long departed
So teach us madness.”Nizar Qabbani, The Trilogy of the Children of the Stones
ডিসেম্বর ৯, ১৯৮৭।
গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবির থেকে শুরু হল এক গণঅভ্যুত্থান, যা পৃথিবীকে শেখালো একটা নতুন শব্দ: ইন্তিফাদা (انتفاضة)।
এটা ছিল ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ আন্দোলনের নব পর্যায়। পাথর নিক্ষেপ, ধর্মঘট, বয়কট ও বিভিন্ন অভিনব ধরণের প্রতিবাদের মাধ্যমে ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষ ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিরোধ গড়ে তোলে (Beinin and Hajjar 2025)। প্রথম ইন্তিফাদা ছিল এক ধরণের গণপ্রতিরোধ, যা সুনির্দিষ্ট সামরিক বা রাজনৈতিক পরিকল্পনার তুলনায় নাগরিক প্রতিরোধ ও সামাজিক সক্রিয়তার মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
প্রথম ইন্তিফাদার মধ্যেই ১৪ ডিসেম্বর গাজা উপত্যকায় গঠিত হয় ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন, যা হামাস নামেই বেশি পরিচিত।
এ সময়ে নারীরা সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালনার মত কাজে অংশ নেয় (Beinin and Hajjar 2025)। আন্দোলনের এই বিশেষ বৈশিষ্ট্য আন্তর্জাতিক মিডিয়া ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
আন্তর্জাতিকভাবে প্রথম ইন্তিফাদা ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামকে দৃশ্যমান করে। ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনিদের সাথে আলোচনায় বসতে বাধ্য করে। যা দীর্ঘমেয়াদে অসলো চুক্তির দিকে নিয়ে যায় (Harms and Ferry 2017)।
ইসরায়েলি সেনাদের প্রতিক্রিয়া ছিল অনুমেয়ভাবেই অত্যন্ত ভয়াবহ। ফিলিস্তিনিরা গণগ্রেপ্তারের শিকার হন, অনেকেই শহিদ হন। প্রথম ইন্তিফাদার প্রত্যক্ষ কোন অর্জন না থাকলেও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনের ছবি বিশ্বব্যাপী সহমর্মিতা তৈরি করে (Chomsky 1999)।
দ্বিতীয় ইন্তিফাদা (২০০০-২০০৫)
“The universal law of human nature: Where there is oppression there is resistance, and “where oppression grows, resistance grows.””
Kwame Ture
সেপ্টেম্বর ২৮, ২০০০।
অ্যারিয়েল শ্যারনের জেরুসালেমে আল-আকসা মসজিদ পরিদর্শন করাকে কেন্দ্র করে দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সূচনা হয়।
এটি প্রথম ইন্তিফাদার তুলনায় অনেক বেশি সহিংস এবং রক্তক্ষয়ী রূপ পরিগ্রহ করে।
ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সহিংস আক্রমণ চালান; যার মধ্যে রয়েছে আত্মঘাতী হামলা, বোমা বিস্ফোরণ ও সশস্ত্র সংঘাত (Pappé 2024)। ইসরায়েল এর প্রতিক্রিয়ায় ব্যাপক সামরিক অভিযান চালায়, পশ্চিম তীরকে দেয়াল তুলে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং শহরগুলোয় সশস্ত্র দমন নীতি চালু করে। হাজার হাজার ফিলিস্তিনি জখম ও শহিদ হন (Filiu 2025)।
দ্বিতীয় ইন্তিফাদার অর্জন হচ্ছে ফিলিস্তিনি প্রশ্নকে আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা। তবে এটি ইসরায়েলের সামনে নিরাপত্তার বয়ান জোরদার করার মোক্ষম সুযোগ এনে দেয়। পশ্চিমা দেশগুলো এই উছিলায় আরও খোলাখুলিভাবে ইসরায়েলের পাশে দাঁড়ায় (Chomsky, Achcar, and Shalom 2007)।
এ সময়ই ফিলিস্তিনে আরেকটি শক্তির উত্থান ঘটে।
যারা অচিরেই ফিলিস্তিনের প্রতিরোধের আন্দোলনের ঐতিহ্যগতভাবে জাতীয়তাবাদী ও বামপন্থী ভাষায় এক নয়া উপাদান যোগ করবে: রাজনৈতিক ইসলাম।
ইসলাম যখন প্রতিরোধের ভাষা: হামাস ও পিআইজে
“If you look at the Muslim tradition, there are terribly progressive elements of it. Islam is not a religion of family; it’s a religion of orphans, which is crucial—Muhammad was an orphan and so on. There is tremendous emancipatory potential in that. The Haiti revolution, the key ideologist was a guy named John Bookman, a slave who knew how to read, that’s why they called him Bookman. But you know which book he was reading? The Koran. Islam played a key role in mobilizing slaves in Haiti.”
Slavoj Žižek
ফিলিস্তিনে রাজনৈতিক ইসলামের প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন মূলত দুটি। হামাস আর প্যালেস্টাইনিয়ান ইসলামিক জিহাদ (পিআইজি)। উভয়ের সাধারণ লক্ষ্য ইসরায়েলি দখলদারিত্বের অবসান ঘটানো। কিন্তু সংগঠন দুটির মতাদর্শ, সাংগঠনিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ধরণে আছে উল্লেখযোগ্য ভিন্নতা। Skare (2025) যুক্তি দিয়েছেন, ফিলিস্তিনি ইসলামপন্থাকে নিছকই ধর্মীয় প্রেরণা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। সেরকম বোঝাপড়া মূলত ইসরায়েলি প্রচারণাকেই শক্তিশালী করে। এই সংগঠনগুলোকে ফিলিস্তিনের মূর্ত বাস্তবতাতেই বুঝতে হব।
হামাসের জন্ম ১৯৮৭ সালের প্রথম ইন্তিফাদার সময়। মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের ফিলিস্তিনি শাখা থেকে। তবে দ্রুতই হামাস কেবল ধর্মীয় সংগঠন নয়; একটি বহুমুখী রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি হিসেবে গড়ে ওঠে। Hroub (2025) দাবি করেছেন, হামাসের কৌশল দ্বিমুখী। একদিকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা। অন্যদিকে স্কুল, হাসপাতাল, ও বিভিন্ন দাতব্য কাজের মধ্য দিয়ে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা। এই দ্বিমুখী কৌশলের কারণে হামাস ফিলিস্তিনি সমাজে নিজেদের শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে পেরেছে।
২০০৬ সালের নির্বাচনে হামাস অপ্রত্যাশিতভাবে বিজয়ী হয়। ২০০৭ সালে গাজার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এই পরিবর্তনের ফলে পরিচালনা করার জন্য হামাসকে একটি রাষ্ট্রতুল্য প্রশাসনিক কাঠামো পেয়ে গেছে।
Hroub (2025)য়ের মতে, হামাসের জনপ্রিয়তা মূলত দুটি কারণে বেড়েছে। একদিকে প্রবলভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত ফাতাহ নেতৃত্বের প্রতি হতাশা। অন্যদিকে হামাসের সামাজিকতা ও সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক কাঠামো।
ফলে, হামাসকে নিছকই কোন “সন্ত্রাসবাদী সংগঠন” নয়, ইসরায়েল রাষ্ট্রীয়ভাবে যেমনটা প্রচার করে থাকে ।
প্যালেস্টাইনিয়ান ইসলামিক জিহাদের (পিআইজে) গল্পটা একটু অন্যরকম। তারা হামাসের মত রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের পথে হাঁটেনি। Skare (2021) দেখিয়েছেন, পিআইজে মূলত ১৯৮০র দশকে কয়েকজন তরুণ ইসলামী বিপ্লবী দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়। যাঁরা ইরানের ইসলামী বিপ্লব দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলেন। সংগঠনটি শুরু থেকেই কেবল সশস্ত্র সংগ্রামে মনোনিবেশ করে। হামাসের তুলনায় তাদের উল্লেখযোগ্য কোন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা সামাজিক সেবামূলক তৎপরতা চোখে পড়ে না। ফলে, ফিলিস্তিনি সমাজে পিআইজের প্রভাব হামাসের তুলনায় অনেক সীমিত, কিন্তু সামরিক অভিযানে তাদের বীরত্বব্যাঞ্জক ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
Skare (2021)র মতে, উল্লিখিত ফারাক দুই সংগঠনের মধ্যে কখনো সহযোগিতা আর কখনো প্রতিযোগিতার এক জটিল সম্পর্ক তৈরি করেছে। তবে সংগঠন দুটি প্রায়ই সমন্বিতভাবে কাজ করেছে। যেমন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একসাথে রকেট হামলা চালানো। এই সমন্বয় দেখায় ফিলিস্তিনি ইসলামপন্থা একরৈখিক নয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী নমনীয়। রাজনৈতিক ইসলামের দুই প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠনে ফারাক আছে। আবার সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যের জমিনও আছে।
২০০৬ সালের নির্বাচন ও গাজায় ইসরায়েলি অবরোধ
“There is no other way to define the regime that Israel has imposed on the Palestinians... other than an open-air prison.”
Francesca Albanese
২০০৬ সালের নির্বাচনে হামাস আশ্চর্যজনকভাবে জয়লাভ করে। কিন্তু গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী পশ্চিমা দেশগুলো ও ইসরায়েল এই ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে গাজার উপর কঠোর অবরোধ আরোপ করে (Filiu 2025)। ২০০৭ সালে হামাস ও ফাতাহর সংঘর্ষের ফলে গাজা কার্যত হামাসের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল ও মিসর যৌথভাবে গাজার ওপর কঠোর অবরোধ আরোপ করে। ইসরায়েল গাজাকে একটা “ওপেন এয়ার প্রিজনে” পরিণত করে। সীমান্ত বন্ধ করে দেয় এবং বিদ্যুৎ ও খাদ্য সরবরাহ সীমিত করে (Khalidi 2020)। গাজার নাগরিকরা খাদ্য, ওষুধ, বিদ্যুৎয়ের মত মৌলিক চাহিদা এবং জ্বালানির অভাবের সম্মুখীন হন। এই মানবিক সংকট সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের ওপর ঋণাত্মক প্রভাব ফেলে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয় এবং নাগরিকরা স্রেফ জীবন ধারণের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। নারী, শিশু, ও বয়স্করা বিশেষভাবে ঝুঁকিগ্রস্ত হন (Filiu 2025)।
এই অবরোধ স্রেফ মানবিক সংকটই তৈরি করেনি। ফিলিস্তিনি সমাজকে সমষ্টিগত শাস্তির মুখে ঠেলে দিয়েছে। Chomsky (1999) একে “আধুনিক উপনিবেশবাদী নীতি” অভিহিত করেছেন।
“সভ্যতার আউটপোস্ট”: ইসরায়েলের পেছনে ইওরোপ-যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের বর্ণবাদিতা
“We should there form a part of a wall of defense for Europe in Asia, an outpost of civilization against barbarism.”
Theodor Herzl, Der Judenstaat
এই লেখাতে আগেই দেখানো হয়েছে, কীভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ইসরায়েল গঠনে মূখ্য ভূমিকা রেখেছিল।
১৯৬৭ সালের জুন যুদ্ধের পর থেকে বসতিস্থাপক-উপনিবেশটি পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মিত্রে পরিণত হয়েছে। দেশটি ইসরায়েলকে বার্ষিক সামরিক সহায়তা দেয় এবং জাতিসংঘে বারবার ইসরায়েলকে রক্ষা করার জন্য ভেটো প্রয়োগ করে (Chomsky, Achcar, and Shalom 2007)। ইওরোপও একইভাবে ইসরায়েলি নীতির বৈধতা জুগিয়ে এসেছে।
কিন্তু ইসরায়েলের প্রতি এই নিঃশর্ত পশ্চিমা সমর্থন কি নিছকই ভূরাজনৈতিক? কেবলই অর্থনৈতিক? এসবই কি একমাত্র কারণ?
না।
পশ্চিমাদের চোখে, ইসরায়েল পশ্চিম এশিয়ায় “সভ্যতার আউটপোস্ট”। “বর্বর” আরবদের মধ্যে “সভ্যতার” এক বাতিঘর। যুক্তরাষ্ট্র ও ইওরোপের বিভিন্ন দেশের নিজেদের উপনিবেশিক অতীতে নিহিত রয়েছে এই বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গির শেকড়।
(Shlaim 2014) যুক্তি দিয়েছেন, এই সমর্থনের ফলেই ইসরায়েল তার প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে ক্রমশ এক “লোহার প্রাচীর” তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। যা শুধু ফিলিস্তিনিদের ওপর জুলুম চালানোতেই নয়, প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথেও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বদলে আগ্রাসী নীতিতেই বিশ্বাসী। ফলে, ইসরায়েল হয়ে উঠেছে একটা সম্প্রসারণবাদী রাষ্ট্র, যুদ্ধ যার চিরস্থায়ী সমরনীতিতে পরিণত হয়েছে।
ফিলিস্তিনের সাথে সংহতি জানানোর কোন অর্থই হয় না, যদি ইসরায়েলের মদতদাতা ইওরোপীয় ও যুক্তরাষ্ট্রীয় বর্ণবাদী শাসক শ্রেণির বিরুদ্ধে কারো রাজনৈতিক অবস্থান না থাকে। আরব ও মুসলিম বিশ্বের শাসক শ্রেণির তরফে এমন অর্থহীন সংহতি প্রায়ই দেখা যায়। যা মূলত মানুষের অনুভূতি নিয়ে একটা খেলা।
গ্লোবাল সলিডারিটি মুভমেন্ট ও ফ্রিডম ফ্লোটিলা
“Palestine is a moral litmus test for the world.”
Angela Davis
কিন্তু পৃথিবীতে শুধু শাসক শ্রেণিই থাকে না। সাধারণ মানুষেরাও থাকে। ফিলিস্তিনের জন্য তাঁদের বিপুল অধিকাংশের সহমর্মিতা আন্তরিক।
২০০১ সালের আগস্টে প্রতিষ্ঠিত হয় ইন্টারন্যাশনাল সলিডারিটি মুভমেন্ট (আইএসএম)।
২০০৫ সালে ফিলিস্তিনে শুরু হয় বয়কট, ডাইভেস্টমেন্ট অ্যান্ড স্যাংশন মুভমেন্ট; যা সংক্ষেপে বিডিএস নামে পরিচিত (রাফিন ২০২৩)। এই প্রতিরোধ আন্দোলনের ব্যাপ্তি ফিলিস্তিনেই সীমিত থাকেনি। মাত্র দুই দশকেই বৈশ্বিক চরিত্র অর্জন করেছে।
২০০৬ সালে শুরু হয় ফ্রি গাজা মুভমেন্ট। ২০১০ সালে তাঁদের প্রথম ফ্রিডম ফ্লোটিলাটি গাজায় অবরোধ ভাঙতে যায়, যা আলোচিত মাভি মার্মারা ঘটনার জন্ম দেয়। ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই প্রয়াস অব্যাহত আছে (Al Jazeera 2025b)।
সমষ্টিগত প্রতিরোধের পাশাপাশি রয়েছে ব্যক্তিগত প্রতিরোধের ঘটনাও। ২০০৩ সালের ১৬ মার্চ মাত্র ২৩-বছর-বয়সী আমেরিকান রাচেল কোরি ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি ধ্বংসের প্রতিবাদে গাজার রাফা সীমান্তে ইসরায়েলি বুলডোজারের আঘাতে প্রাণ দেন (Speri 2022)। ২১ বছর পর, ২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি মার্কিন বিমানবাহিনীর ২৫-বছর-বয়সী সৈনিক অ্যারন বুশনেল গাজা জেনোসাইডের প্রতিবাদে ওয়াশিংটন ডি.সি.তে ইসরায়েলি দূতাবাসের নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়ে আত্মাহুতি দেন (Fernández 2024)। দুজনের কেউই জন্মসূত্রে আরব বা মুসলিম নন। তবু তাঁরা ফিলিস্তিনের জন্য নিজেদের শহিদ করেছেন। হয়ে উঠেছেন ফিলিস্তিনের প্রতি বৈশ্বিক সংহতির প্রতীক।
ইহুদি মাত্রই জায়নবাদী এরকম একটি ধারণা আছে। ধারণাটি সঠিক নয়। ১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বরে গঠিত হয় জায়নবাদ-বিরোধী ইহুদিদের সংগঠন জিউইশ ভয়েস ফর পীস (জেভিপি)। যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদিদের জায়নবাদের প্রভাবমুক্ত করতে ও ফিলিস্তিনিদের সাথে ইনসাফের ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি নিয়ে এরা কাজ করে চলেছে। ভিয়েনা থেকে আধুনিক রাজনৈতিক জায়নবাদের শুরু হয়েছিল। নিয়তির মুচকি হাসিতে ২০২৫ সালের জুনে সেই ভিয়েনাতেই অনুষ্ঠিত হয় প্রথম জায়নবাদ-বিরোধী কংগ্রেস। ইতিহাস এভাবেই বদলায়।
কিন্তু ইতিহাসের এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়া এতই ধীর, তা কোন জেনোসাইড ঠেকাতে পারে না।
গাজা জেনোসাইড (২০২৩-চলমান)
“We are the victims of the victims, the refugees of the refugees.”
Edward Said
অক্টোবর ৭, ২০২৩।
ইসরায়েলে হামাস এক অপ্রত্যাশিত হামলা চালায়, যাতে প্রায় ১২০০ বেসামরিক ইসরায়েলি নিহত হন।
এই হামলার জবাবে ইসরায়েল যে পাল্টা হামলা চালিয়েছে তাকে একাধিক ঐতিহাসিক ও মানবাধিকার সংস্থা জেনোসাইড আখ্যায়িত করেছেন (Bartov 2025; Shlaim 2025; Amnesty International 2024; HRW 2024)।
২০২৫ সালের ২ অক্টোবর পর্যন্ত এই জেনোসাইডে ৬৬,০০০য়েরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। যাঁদের মধ্যে অন্তত ৪৪০ জন ক্ষুধায় মৃত্যুবরণ করেছেন। যাঁদের মধ্যে অন্তত ১৪৭ জন শিশু (Al Jazeera 2025)।
ইসরায়েল নির্বিচারে স্থল অভিযান আর বিমান হামলা চালিয়ে অবরুদ্ধে গাজা উপত্যকার পুরো বেসামরিক কাঠামো ধবংস করে ফেলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের মত মৌলিক চাহিদার সাথে সম্পর্কিত সব স্থাপনায় পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়েছে ( Filiu 2025)। যা গাজার জনগণকে কার্যত সাব-হিউম্যানে পরিণত করেছে (Amnesty International 2024)।
পানি সরবরাহ গাজায় ইচ্ছাকৃতভাবে সীমিত রাখা হয়েছে (Human Rights Watch 2024)। গাজা পরিণত হয়েছে একুশ শতকের কারবালায়।
এই হাজার প্রাণের চিৎকারের বিনিময়ে ফিলিস্তিন এখন পর্যন্ত যা পেয়েছে তা হল যুক্তরাজ্য আর ফ্রান্সসহ কতগুলো পশ্চিমা দেশের নেহাতই ফরমায়েশি স্বীকৃতি।
উপসংহার
“We were mistaken when we thought the homeland was only the past... the homeland is the future.”
Ghassan Kanafani, Returning to Haifa
ফিলিস্তিনের ইতিহাস হল এক দীর্ঘ রাষ্ট্রহীনতার ইতিহাস। একটি রাষ্ট্রহীন জাতি হিসেবে ফিলিস্তিনিদের লড়াই সংগ্রাম নিছকই ভূমি অধিকার পাওয়ায় সীমিত নেই। বরং অস্তিত্ব ও মর্যাদার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকট আজ আর নিছকই কোন আঞ্চলিক সংকট নেই। ইনসাফের জন্য মানুষের লড়াইয়ের এক বৈশ্বিক প্রতীক। ইন্তিফাদা হয়ে উঠেছে সর্বজনীন মুক্তিবাসনা।
কে জানে, ফিলিস্তিন হয়তো একা মুক্ত হবে না, নিজেকে মুক্ত করার ভেতর দিয়ে একদিন পশ্চিম এশিয়া সহ পুরো মানবজাতিকে মুক্ত করবে!
তথ্যসূত্র
রাফিন, ইরফানুর রহমান। ২০২৩। “ফিলিস্তিন।” অক্টোবর ২, ২০২৫ তারিখে অ্যাকসেস করা হয়েছে। https://shomoyrekha.com/palestine/
al-Hout, Bayan Nuwayhed. 2004. Sabra and Shatila: September 1982. Pluto Press.
Achcar, Gilbert. 2024. The Arabs and the Holocaust: The Arab-Israeli War of Narratives. Metropolitan Books.
Al Jazeera. 2025. “Gaza Tracker.” March 18, 2025. https://www.aljazeera.com/news/2025/3/18/gaza-tracker
— 2025b. “Freedom Flotillas: A History of Attempts to Break Israel’s Siege of Gaza.” June 9, 2025. https://www.aljazeera.com/news/2025/6/9/freedom-flotillas-a-history-of-attempts-to-break-israels-siege-of-gaza
Amnesty International. 2024. ‘You Feel Like You Are Subhuman’: Israel’s Genocide Against Palestinians in Gaza. Amnesty International Publications. https://www.amnesty.org/en/documents/mde15/8668/2024/en/
Asbridge, Thomas. 2010. The Crusades: The Authoritative History of the War for the Holy Land. Ecco.
Bartov, Omer. 2025. “I’m a Genocide Scholar. I Know It When I See It.” The New York Times, July 15, 2025. https://www.nytimes.com/2025/07/15/opinion/israel-gaza-holocaust-genocide-palestinians.html.
Bazian, Hatem. 2016. Palestine... It Is Something Colonial. Amrit Publishers.
BDS Movement
https://bdsmovement.net/
Beinin, Joel, and Lisa Hajjar. 2025. “Palestine and Israel—A Primer.” Middle East Research and Information Project. https://merip.org/palestine-israel-primer/
Chomsky, Noam. 1999. Fateful Triangle: The United States, Israel, and the Palestinians. Updated ed. South End Press.
Chomsky, Noam, Gilbert Achcar, and Stephen R. Shalom. 2007. Perilous Power: The Middle East and U.S. Foreign Policy. Paradigm Publishers.
Day, John. 2002. Yahweh and the Gods and Goddesses of Canaan. Sheffield Academic Press.
Fernández, Belén. 2024. “Suicide vs Genocide: Rest in Power, Aaron Bushnell.” Al Jazeera, February 26, 2024. https://www.aljazeera.com/opinions/2024/2/26/suicide-vs-genocide-rest-in-power-aaron-bushnell.
Filiu, Jean-Pierre. 2025. Gaza: A History. 2nd ed. Oxford University Press.
Finkelstein, Norman G. 2024. The Holocaust Industry: Reflections on the Exploitation of Jewish Suffering. Verso.
First Jewish Anti-Zionist Congress Vienna 2025.
https://www.juedisch-antizionistisch.at/en
Green, David B. 2015. “3761 BCE: The World Is Created, According to the Hebrew Calendar and an Obscure Sage.” Haaretz, October 7.
https://www.haaretz.com/jewish/2015-10-07/ty-article/3761-bce-the-world-is-created/0000017f-e4be-d7b2-a77f-e7bf482b0000
Harms, Gregory, and Todd M. Ferry. 2017. The Palestine-Israel Conflict: A Brief Introduction. 4th ed. Pluto Press.
Hroub, Khaled. 2025. Hamas: A Beginner’s Guide. 3rd ed. Pluto Press.
Human Rights Watch. 2024. Extermination and Acts of Genocide: Israel Deliberately Depriving Palestinians in Gaza of Adequate Water. Human Rights Watch. https://www.hrw.org/report/2024/12/19/extermination-and-acts-genocide/israel-deliberately-depriving-palestinians-gaza
Interactive Encyclopedia of the Palestinian Question
https://www.palquest.org/
International Solidarity Movement
https://palsolidarity.org/
Isaac, Munther. 2025. Christ in the Rubble: Faith, the Bible, and the Genocide in Gaza. Wm. B. Eerdmans Publishing Co.
Irving, Sarah. 2012. Leila Khaled: Icon of Palestinian Liberation. Pluto Press.
Jacobin. 2025. “Palestine’s Left History.” Jacobin Podcast, June 2025. https://jacobin.com/2025/06/palestine-left-history-jacobin-podcast
Jewish Voice for Peace.
https://www.jewishvoiceforpeace.org/
Khalidi, Rashid. 2020. The Hundred Years’ War on Palestine: A History of Settler Colonialism and Resistance, 1917–2017. Metropolitan Books.
Masalha, Nur. 2018. Palestine: A Four Thousand Year History. Zed.
Morris, Benny. 2004. The Birth of the Palestinian Refugee Problem Revisited. Cambridge University Press.
— 2008. 1948: A History of the First Arab–Israeli War. Yale University Press.
Pappé, Ilan. 2006. The Ethnic Cleansing of Palestine. Oneworld Publications.
— 2016. The Idea of Israel: A History of Power and Knowledge. Verso.
— 2024. A Very Short History of the Israel–Palestine Conflict. Verso.
Rodinson, Maxime. 1982. Israel and the Arabs. 2nd ed. Trans. Michael Perl and Brian Pearce. Penguin.
— 1988. Israel: A Colonial-Settler State? Trans. Sharon E. Lyon. Pathfinder Press.
Said, Edward W. 1992. The Question of Palestine. Reprint. Vintage Books.
Sayigh, Rosemary. 1979. Palestinians: From Peasants to Revolutionaries. Zed Books.
Shlaim, Avi. 1988. Collusion Across the Jordan: King Abdullah, the Zionists, and the Partition of Palestine. Oxford University Press.
— 2014. The Iron Wall: Israel and the Arab World. 2nd ed. W. W. Norton & Company.
— 2025. Genocide in Gaza: Israel’s Long War on Palestine. The Irish Pages Press.
Skare, Erik. 2021. A History of Palestinian Islamic Jihad: Faith, Awareness, and Revolution in the Middle East. Cambridge University Press.
— 2025. Road to October 7: A Brief History of Palestinian Islamism. Verso.
Speri, Alice. 2022. “As Israel Keeps Killing Americans, U.S. Officials Give It a Pass.” The Intercept, July 13, 2022. https://theintercept.com/2022/07/13/israel-rachel-corrie-shireen-abu-akleh-killings/.
Tubb, Jonathan N. 1998. Canaanites. British Museum Press.
Whitelam, Keith W. 1996. The Invention of Ancient Israel: The Silencing of Palestinian History. Routledge.


